হোম > বিশ্লেষণ

নীরবতার চরম মূল্য: ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেভাবে হারিয়ে গেল উপসাগরীয় অঞ্চলে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ভারতের বাছাইকৃত নীরবতাই দেশটির বৈশ্বিক অবস্থানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: দ্য ক্রেডল

নয়াদিল্লি, সেপ্টেম্বর ২০২৩। ঝাড়বাতির আলোয় ঢাকা এক অভিজাত ছাদের নিচে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা এক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর (আইএমইসি) নামের এক ‘আধুনিক মসলার পথ’।

গঠিত হয় রেল, সমুদ্রপথ ও ডিজিটাল কেবলের এক নেটওয়ার্কের ব্লু-প্রিন্ট। এর লক্ষ্য ছিল চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করা এবং অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কৌশলগত যুক্তির ভিত্তিতে। সেদিনের সেই সভাকক্ষে যেন কালি আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার গন্ধ ভাসছিল।

বন্দর আব্বাস, মার্চ ২০২৬। হরমুজ প্রণালিতে এক বিশাল তেলবাহী জাহাজ নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে। আকাশজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় তৈরি হয়েছে এক আগুনের পর্দা। ইসরায়েল ও ইরান সরাসরি পাল্টাপাল্টি হামলায় লিপ্ত। এটি এমন এক আগ্রাসী যুদ্ধ, যার সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে। যে আইএমইসি রেলপথ হাইফা ও নেগেভ মরুভূমি পেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন হয়ে উঠেছে ভূরাজনৈতিক ফাটল রেখা। শিপিং জায়ান্টগুলো ইসরায়েলি বন্দরে যাতায়াত স্থগিত করেছে। করিডরটি এখন এক ভুতুড়ে অবশেষ।

কীভাবে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়াল ভারত? যে দেশটি একসময় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অন্যতম স্তম্ভ ছিল, সেখানে আজ তাদের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে। আর সে নিজে নীরব হয়ে দেখছে।

বর্তমানকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ২০২৩ সালের সেই সন্ধিক্ষণে। একদিকে ছিল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েল হয়ে ছুটে যাওয়া ইস্পাত আর ফাইবার অপটিকের পথ আইএমইসি। অন্যদিকে ছিল ইন্টারন্যাশনাল নর্থ সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর (আইএনএসটিসি)। নিঃশব্দ, ধুলোমাখা এক রুট, যা ইরান ও মধ্য এশিয়া পেরিয়ে মুম্বাইকে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের সঙ্গে যুক্ত করে, বন্দর আব্বাস হয়ে। বহু বছর ধরে ভারত দ্বিতীয় পথটিকেই লালন করেছে। ইরানের চাবাহার বন্দরে ৮৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে—যা আইএনএসটিসির সমুদ্রপথের প্রবেশদ্বার—এবং আরও বিনিয়োগের প্রস্তুতিও ছিল।

আইএমইসি ঘোষণার পর সিদ্ধান্ত সহজ মনে হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কল্পিত ‘স্বাভাবিকীকৃত মধ্যপ্রাচ্যের’ সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারত সেই করিডরের পক্ষে দাঁড়ায়। কিন্তু এই বাজি দাঁড়িয়েছিল এক নাজুক ভিত্তির ওপর। তারা ধারণা করেছিল—আব্রাহাম অ্যাকর্ডস যেকোনো আঞ্চলিক ঝড়েও টিকে থাকবে। কিন্তু আইএমইসি ঘোষণার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গাজা যুদ্ধ শুরু হয়, আর ভিত্তি নড়ে যায়। ২০২৬ সালে ইরান ও ইসরায়েলের সরাসরি সংঘর্ষের সময় করিডরটি শুধু স্থবিরই নয়—অচল হয়ে পড়ে।

আর চাবাহার? ২০২৫ সালের শেষ দিকে, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে ২৫ শতাংশ মার্কিন শুল্কের মুখে পড়তে হবে—এমন হুমকির মুখে ভারত নীরবে চাবাহার থেকে সরে দাঁড়ায়। পরিচালকেরা পদত্যাগ করেন, ওয়েবসাইট অচল হয়ে যায়, তহবিল তুলে নেওয়া হয়। এই প্রস্থান ছিল নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত, কিন্তু বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—ইরানে একটি কৌশলগত সম্পদ আর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে বেছে নিতে হলে, ভারত পরেরটিকেই বেছে নেবে।

এবার তেলে একটি যাত্রাপথ অনুসরণ করুন। ২০২৩ সালে ভারত হয়ে ওঠে রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ইউরোপীয় ক্রেতারা দূরে থাকায় ভারত পায় বড় ছাড়—কখনো কখনো ব্রেন্টের বাজার মূল্যের চেয়ে ৪০ ডলার কমে। মস্কো খুশিমনে সরবরাহ করেছে; দিল্লির ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু ২০২৬-এ এসে সেই স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে যায়। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ায় ভারত রুশ তেল কেনা কমাতে শুরু করে, আর যখন কিনেছে, তখন বাজারদরেই কিনেছে।

এরপর আসে ইরানি তেল। ২০২৬ সালের মার্চে ভারতীয় শোধনাগারগুলো ৫০ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে—তাও আবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৩০ দিনের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ছাড়পত্র পাওয়ার পর এবং প্রতি ব্যারেলে ৭ ডলার বেশি দামে। কোনো ছাড় নেই। কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নেই। ট্যাংকারগুলো এসেছে আমেরিকার শর্তে, ভারতের নয়।

নিরপেক্ষ কূটনীতির অঙ্ক উল্টে গেছে। একাধিক পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে কৌশলগত পণ্য কম দামে পাওয়ার যে লক্ষ্য ছিল, সেটিই হারিয়ে গেছে। ভারত এখন রুশ ও ইরানি উভয় তেলের জন্যই বাজারদর দিচ্ছে, অথচ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কাঠামোর মধ্যেই আবদ্ধ।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তটি আসে ২০২৬ সালের শুরুতে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। ইরান তখন ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা—উভয়েরই সদস্য। উজবেকিস্তানের আস্তানায় এসসিও সম্মেলনের হলঘরে আগ্রাসন নিন্দা করে একটি প্রস্তাব তোলা হয়। ভারত সেখানে ভোটদানে বিরত থাকে। ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও একই নীরবতা।

এটি ১৯৫৬ সালের সেই ভারত নয়, যে কিনা সুয়েজ সংকটের সময় মিসরের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, নিজের সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে। এটি ১৯৭১ সালের সেই ভারতও নয়, যে কিনা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে দৃঢ়ভাবে সহযোগিতা করেছিল। দেশটি সে সময় স্পষ্ট অবস্থানের মধ্য দিয়েই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন চর্চা করেছিল। আজকের ভারত এমন সব ফোরামে বসছে—ব্রিকস, এসসিও—যেগুলো গঠনে তার নিজেরই ভূমিকা আছে। কিন্তু আক্রমণের মুখে থাকা এক সদস্যের প্রতি সংহতি জানাতে সে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

এই দ্বৈত আচরণ গ্লোবাল সাউথের চোখ এড়ায় না। আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজের ২০২৬ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় আরব ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রতি আস্থার মান ১৮ পয়েন্ট কমে গেছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের মুখপাত্র হিসেবে ভারতের যে ন্যারেটিভ বা আখ্যান ছিল, তা নিঃশব্দে নতুন করে লেখা হচ্ছে।

এই পশ্চাদপসরণ ব্যাখ্যা করা যায় কীভাবে? একটি উত্তর লুকিয়ে আছে সেই অভিজাত শ্রেণির গঠনে, যারা ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে—আমলারা, করপোরেট প্রধানেরা এবং তাদের সন্তানরা; যারা মুম্বাই, নিউইয়র্ক ও লন্ডনে অনায়াসে চলাচল করে। ভারতের বৃহত্তম করপোরেট গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের স্টক এক্সচেঞ্জে পুঁজি তোলে। তাদের নির্বাহীরা আমেরিকান করপোরেট বোর্ডে বসেন। ভারতের মুকুটমণি আইটি শিল্পের ৭০ শতাংশের বেশি আয় আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। যখন যুক্তরাষ্ট্র শুল্কের হুমকি দেয়, তখন এই স্বার্থগুলো এক কণ্ঠে কথা বলে—এবং সরকার তা শোনে।

এটি কোনো ষড়যন্ত্র নয়—এটি কাঠামোর প্রশ্ন। এক প্রজন্মের ভারতীয় নীতিনির্ধারক, যারা আমেরিকান ও ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত, পশ্চিমা থিংক-ট্যাংক ও গণমাধ্যমে স্বচ্ছন্দ—চাপ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই আটলান্টিক বলয়ের দিকেই ঝুঁকে পড়েন। কম প্রতিরোধের সেই পথ—যে পথ ব্যক্তিগত ও পেশাগত নেটওয়ার্ককে অক্ষুণ্ন রাখে—শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের দিকেই গিয়ে মেশে। ঔপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন তখন বিলাসিতায় পরিণত হয়, যখন সেই অভিজাতদের নিজের ভাগ্যই বাঁধা থাকে সেই শক্তির সঙ্গে, যাকে ভারসাম্য করার কথা ভারতের।

এর মূল্য হিসেবে ভারত কী হারিয়েছে, তার হিসাব এখন স্পষ্ট। ইরান চীনের সহায়তায় চাবাহার বন্দরকে নীরবে নতুনভাবে ব্র্যান্ড করছে। রাশিয়া তার তেলের রপ্তানি ঘুরিয়ে নিয়েছে চীনের দিকে। ২০২৬ সালের শুরুতে রাশিয়ার সমুদ্রপথে তেলের মধ্যে ভারতের অংশ ৪০ শতাংশ থেকে নেমে ১৫ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। ইন্ডিয়া–মিডল ইস্ট–ইউরোপ ইকোনমিক করিডর একসময় ছিল ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক, এখন তা হয়ে উঠছে এমন এক সতর্কবার্তা, যেখানে অনিশ্চিত জোটের ওপর দাঁড়িয়ে মহাপরিকল্পনা গড়ার ঝুঁকি স্পষ্ট।

কিন্তু আরও গভীর ক্ষতি হলো বিশ্বাসযোগ্যতার। গ্লোবাল সাউথে এখন ভারতকে আর এমন নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা হয় না, যে দীর্ঘমেয়াদি স্বাধীনতার জন্য স্বল্পমেয়াদি ক্ষতি মেনে নিতে প্রস্তুত। বরং তাকে দেখা হয় এমন এক শক্তি হিসেবে, যা চাপ বাড়লে পিছিয়ে যায়, তার অংশীদারদের একা পরিণতির মুখে ফেলে রেখে।

একটি ভবিষ্যৎ সম্মেলনের কথা কল্পনা করুন—হয়তো বন্দুকের শব্দ থেমে যাওয়ার পর একটি ব্রিকস জোটের সমাবেশ। ভারতের প্রতিনিধি বসে আছে এক টেবিলে, যেখানে রয়েছে ইরান, রাশিয়া, চীন এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো। ঘরজুড়ে নীরবতা। প্রশ্নটি ভাসছে বাতাসে—ভারত কি আবার ফিরে যাবে বান্দুং-এর নীতিতে, পঞ্চশীলের দর্শনে, পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক বহুমুখী বিশ্বের ধারণায়? নাকি সে চলতে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার এক জুনিয়র অংশীদার হিসেবে, যখন তার মিত্ররা আক্রমণের মুখে—তখনো নীরব থেকে?

পছন্দটি পূর্ব আর পশ্চিমের মধ্যে নয়। এটি এমন এক সার্বভৌমত্বের দর্শনের মধ্যে, যা সাহস দেখানোর মতো অবস্থান দাবি করে, আর এমন এক বাস্তববাদের মধ্যে, যা স্বল্পমেয়াদি স্বস্তিকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বলে ভুল করে। যে দেশ একসময় বিশ্বকে দেখিয়েছিল, নিরপেক্ষ থাকা মানে কী—আজ তার জন্য সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা হলো, সেই স্মৃতিকে আবার মনে করা।

দ্য ক্রেডল থেকে অনূদিত

ইরানকেও পারমাণবিক শক্তিধর বানাতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানের কাদির খান, যেভাবে চলেছিল কার্যক্রম

ইরান থেকে শূন্য হাতে ফিরছেন ট্রাম্প

নেতানিয়াহুসহ ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা আজ বড় একা

যুদ্ধবিরতি টিকবে না, অকূল পাথারে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু

ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর যুদ্ধ যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের তুরুপের তাস ইরানের হাতে তুলে দিল

ইরান হরমুজে টোল বসালে বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের কী হবে

ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব—শান্তির রূপরেখা নাকি ট্রাম্পের জন্য কূটনৈতিক ফাঁদ

আংশিক ‘জয়’ ট্রাম্পের, তবে আলোচনার দিনগুলো হবে অত্যন্ত জটিল

হরমুজ প্রণালিতে কি ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো

‘ভালো বিকল্প’ না থাকায় যুদ্ধবিরতিতে রাজি ট্রাম্প, কিন্তু ইসরায়েল মানবে কি