বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের কৌতূহল এবার চোখে পড়ার মতো। কারণ এই নির্বাচনটি শুধু একটি ক্ষমতার সাধারণ পালাবদল নয়, বরং এটি ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যুবসমাজের ব্যাপক বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এই নির্বাচনকে অনেকে দেখছেন গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের সম্ভাবনা হিসেবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এই নির্বাচনকে ২০২৬ সালের ‘সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ১২ কোটি ৭০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ভোটার অংশ নিচ্ছেন এই নির্বাচনে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে এসেছেন ৩৯৪ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ৮০ জন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, ২৪০ জন বিভিন্ন দেশ থেকে আগত এবং ৫১ জন বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই হিসেবে এবার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সংখ্যা ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি আরও ২১টি দেশ থেকে পর্যবেক্ষকেরা এসেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনস, মালয়েশিয়া, জর্ডান, তুরস্ক, ইরান, জর্জিয়া, রাশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়ার প্রতিনিধিরা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এক দশকের বেশি সময় পর এটিকে অনেকেই প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে দেখছেন। ঢাকার রাস্তায় ভোট ঘিরে কৌতূহল ও প্রত্যাশার আবহ স্পষ্ট।
নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। মোট প্রার্থী ১ হাজার ৯৮১ জন, যার মধ্যে ২৪৯ জন স্বতন্ত্র। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গেছে।
নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকা প্রধান দুটি জোটের একদিকে রয়েছে মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির নেতৃত্বে আছেন তারেক রহমান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। অন্যদিকে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট। এই জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। তবে এনসিপি আন্দোলনের পর থেকেই বিভক্ত ও রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ হিসেবে সমালোচিত।
জামায়াত দাবি করছে, নির্বাচিত হলে তারা ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের অধীনে থেকেই সংস্কারমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। এক নির্বাচনী সমাবেশে দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এটি অতীতের ‘নষ্ট রাজনীতি কবর দেওয়ার’ সুযোগ।
এদিকে ভোটারদের সামনে বড় ইস্যু এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের দুর্নীতি। নিবন্ধিত ভোটারদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। তরুণদের বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকট নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির দ্বন্দ্ব জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যেন কেউ একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে না পারে—এই লক্ষ্যেই সংস্কারগুলো প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তাৎপর্যপূর্ণ। নেপাল ও ভারতের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের ‘নির্বাচনী মৌসুমের কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন—নির্বাচনে জামায়াত ভালো ফল পেলে আঞ্চলিকভাবে ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। আর এনসিপি ভালো করলে, তারা রাজপথ থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার দৃষ্টান্ত হবে। আর দেশ পরিচালনায় পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা বিএনপির জন্য এই নির্বাচন দেড় দশকের বেশি সময় ধরে গণতন্ত্রের জন্য তাদের সংগ্রামকে সফল করার অন্তিম পথ।
সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, তরুণদের আত্মত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার এক কঠিন পরীক্ষার মঞ্চ। এমন উত্তেজক এবং ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল থাকাই স্বাভাবিক।