হোম > বিশ্লেষণ

দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ

শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে হাত ছিল ইসরায়েলের: গোপন নথি প্রকাশ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

গৃহযুদ্ধ চলার সময়ে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

শ্রীলঙ্কা ১৯৭০ সালে আরব রাষ্ট্রগুলোর চাপে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু দেশটির নির্মম গৃহযুদ্ধ শুরুর প্রায় এক বছর পর, ১৯৮৪ সালে কলম্বোয় মার্কিন দূতাবাসে একটি ইসরায়েলি ‘ইন্টারেস্টস সেকশন’ (স্বার্থরক্ষা দপ্তর) খোলা হয়। সম্প্রতি ইসরায়েল স্টেট আর্কাইভ আংশিকভাবে ১৯৮০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শ্রীলঙ্কা–ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেছে। এই নথিগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং নতুন কিছু বিবরণও সামনে এনেছে।

যেমন, ১৯৮৭ সালের ১১ ডিসেম্বর ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা এক পর্যালোচনায় বলা হয়, শ্রীলঙ্কা ১৯৮৪ সালে এই ‘ইন্টারেস্টস সেকশন’ স্থাপনে সম্মত হয়েছিল। কারণ, শ্রীলঙ্কার তৎকালীণ সরকার চেয়েছিল ইসরায়েল ‘তামিল সন্ত্রাসবাদ সমস্যা সমাধানে সহায়তা করুক।’ ১৯৮৮ সালের মধ্যে ইসরায়েল দেশটির কাছে ৩ কোটি ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে।

১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঠানো এক কূটনৈতিক বার্তায় ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া বিভাগের পরিচালক লেখেন, ইসরায়েল শ্রীলঙ্কার কাছে ১ কোটি ডলারে ছয়টি ডভোরা-ক্লাস দ্রুতগামী টহল নৌকা বিক্রি করেছে। ১৯৮৬ সালের ২০ জুনের আরেক বার্তায় কলম্বোয় ইসরায়েলি ইন্টারেস্টস সেকশনের প্রধান হাইম দিবোন উল্লেখ করেন, উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বিনিময়ে মিনি–উজি সাবমেশিন গানও বিক্রি করা হয়েছে। ১৯৮৭ সালের ১৫ জুনের আরেক বার্তায় দিবোন জানান, ইসরায়েল শ্রীলঙ্কাকে ইলেকট্রনিক ফেন্স বা বেড়া, যোগাযোগ সরঞ্জাম, মেশিনগান এবং গোলাবারুদও সরবরাহ করেছে।

ইসরায়েল শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জুনিয়াস রিচার্ড জয়াবর্ধনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদেরও প্রশিক্ষণ দেয়। ১৯৮৬ সালের ১৮ আগস্ট পাঠানো এক বার্তায় দিবোন লেখেন, ‘গত সপ্তাহে আমরা প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ইউনিটের প্রায় ৩০ সদস্যের জন্য একটি শুটিং কোর্স পরিচালনা করেছি।’ তিনি জানান, প্রশিক্ষণটি ৪ দিন স্থায়ী হয় এবং প্রশংসা কুড়ায়।

শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীকে যেভাবে প্রশিক্ষণ দেয় ইসরায়েল

ইসরায়েল শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীকেও প্রশিক্ষণ দেয়। ১৯৮৭ সালের ২৩ জানুয়ারির এক বার্তায় দিবোন জানান, ইসরায়েলি সামরিক প্রশিক্ষকদের জনসমক্ষে ‘কৃষি উপদেষ্টা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একই দিনের আরেক বার্তায় তিনি লেখেন, ‘জাফনা অঞ্চল তামিলদের নিয়ন্ত্রণে, কোনো চ্যালেঞ্জ নেই’ এবং ইসরায়েলি প্রশিক্ষক দলের কমান্ডারের মতে স্থানীয় বাহিনী বিশ্বাস করত এই প্রশিক্ষণ তাদের ‘দ্রুত আক্রমণে জাফনা দখলে’ প্রস্তুত করবে। মহড়ার সময় প্রশিক্ষণার্থীদের প্রশ্নগুলোও সম্ভাব্য ওই অভিযানের সময় দেখা দিতে পারে এমন সমস্যাকে ঘিরেই ছিল।

এ ছাড়া, ১৯৮৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির এক বার্তায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক শামিরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা আরিয়েহ মেকেল প্রস্তাব দেন, শামির যেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ শুলজকে জানান যে—ইসরায়েল ‘তামিলদের আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে শ্রীলঙ্কার জরুরি সহায়তার অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।’ তিনি বলেন, এই সহায়তার মধ্যে ছিল ‘অফিসারদের প্রশিক্ষণ এবং ৩০ লাখ ডলার মূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদের জরুরি সরবরাহ।’

১৯৮৭ সালের ১৮ মার্চ দিবোন জানান, তিনি শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। দিবোন তাঁকে বলেন, ‘মাত্র পাঁচজন ইসরায়েলি প্রশিক্ষকই উত্তরের যুদ্ধ পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পেরেছে।’ যদিও বার্তায় তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি বাড়িয়ে বলেছেন। জবাবে মন্ত্রী বলেন, তিনি ‘যে কারও কাছ থেকেই—এমনকি শয়তানের কাছ থেকেও—সহায়তা পেতেও রাজি।’ দিবোন উত্তর দেন, তিনি আশা করেন ‘আমরা (ইসরায়েলিরা) শয়তান নই’, আর মন্ত্রী ‘শুধু হাসলেন।’

শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যমে ইসরায়েলি সামরিক প্রশিক্ষকদের উপস্থিতির খবর ফাঁস হওয়ার পর, ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বরের এক বার্তায় ইসরায়েলি কূটনীতিক ইলান পেলেগ রসিকতা করে লেখেন, ‘আমাদের এখন সরকারবিরোধী (বামপন্থী জনতা ভিমুক্তি পেরুমুনা) জেভিপি বিদ্রোহীদের বোঝাতে হচ্ছে যে এই প্রশিক্ষণ আসলে তাদেরই উপকারের জন্য ছিল।’

এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয়, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানতেন যে প্রশিক্ষণ কেবল তামিল বিদ্রোহ দমনের জন্যই নয়। ইসরায়েল এক বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ দেয়, যা তাদের সহিংস পদ্ধতির জন্য কুখ্যাত ছিল। ১৯৮৭ সালের ১৮ মার্চের এক বার্তায় দিবোন জানান, কলম্বোয় মার্কিন উপ–রাষ্ট্রদূত ইসরায়েলের স্থানীয় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাকে অনুমোদন দিলেও স্পেশাল টাস্ক ফোর্সকে (এসটিএফ) সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।

তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদে এটি ‘সন্দেহজনক বিনিয়োগ’ এবং দীর্ঘমেয়াদে ‘গুরুতর ভুল।’ কারণ, এই বাহিনী ‘ভয়াবহ গণহত্যা’ চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ছেলে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরে গেলে ‘এই বাহিনী ভেঙে দেওয়া হবে এবং এর সঙ্গে যুক্ত যে কেউ খুবই সংকটপূর্ণ অবস্থায় পড়বে।’

আমেরিকার এই সতর্কতা সত্ত্বেও, ১৯৮৭ সালের ১৯ আগস্টের এক বার্তায় ইসরায়েলি কূটনীতিক ইলান পেলেগ জানান, শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্টের ওপর হত্যাচেষ্টার পর সরকার সিদ্ধান্ত নেয় ‘এসটিএফ থেকে সদস্য নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি ভিআইপি সুরক্ষা ইউনিট অবিলম্বে গঠন করা হবে’, এবং ইসরায়েল ‘চার সপ্তাহের জন্য তিন সদস্যের একটি দল পাঠিয়ে ইউনিটটিকে প্রশিক্ষণ দিতে সম্মত হয়।’ পৃথক বার্তায় দিবোন ব্যাখ্যা করেন, এসটিএফ একটি ‘এলিট ইউনিট’, যেখানে ‘নীতি নির্ধারণ করেন প্রেসিডেন্টের ছেলে’, এবং তিনি ইউনিটের কমান্ডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

শ্রীলঙ্কায় ইসরায়েলের প্রকৃত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকলেও, দিবোন এই দপ্তরের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১৯৮৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের এক বার্তায় তিনি লেখেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল শ্রীলঙ্কার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে জনকূটনীতি প্রয়োজন। তবে তিনি একটি সুনামসংক্রান্ত সমস্যার কথা উল্লেখ করেন—ইন্টারেস্টস সেকশনটিকে ব্যাপকভাবে দেখা হচ্ছিল ‘তামিল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরকারকে সহায়তা করার জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি মিশন’ হিসেবে। তিনি যোগ করেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এটি প্রতিষ্ঠার পক্ষে দেওয়া সরকারি ব্যাখ্যাগুলোর একটি ছিল।’

১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তারিখের এক তারবার্তায় দিবোন জানান, মোসাদের একজন প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট রিচার্ড জয়াবর্ধনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রেসিডেন্ট সেখানে ইসরায়েলি সামরিক প্রশিক্ষকদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। দিবোন লেখেন, প্রেসিডেন্ট ‘পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী বলে মনে হয় এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন—সম্ভবত এমন উপদেষ্টাদের অত্যধিক আশাবাদী মূল্যায়নের কারণে, যারা মনে করেন তিনি এমন কথাই শুনতে চান।’

পরদিন পাঠানো আরেকটি তারবার্তায় দিবোন জানান, দুই মোসাদ কর্মকর্তা স্থায়ীভাবে শ্রীলঙ্কায় কাজ করছিলেন। অন্য এক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, তাদের উপস্থিতি সবার জানা ছিল এবং ‘আমরা মাঝেমধ্যে মোসাদের লোকদের সম্পর্কে প্রশংসাসূচক মন্তব্য শুনি, যারা তাদের অন্যান্য গুণের পাশাপাশি ফল ও সবজি ফলাতেও জানে।’ এই বিষয়টি ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মীদের কৃষি বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে কাজ করার সাধারণ ছদ্মবেশের প্রতি ইঙ্গিত।

আরব দেশগুলো এবং শ্রীলঙ্কার বিরোধী দলের চাপের মধ্যে কলম্বোতে ইসরায়েলি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দপ্তর বন্ধ করার দাবির প্রেক্ষাপটে, ১৯৮৭ সালের ৬ ও ১৪ আগস্টের তারবার্তায় জানানো হয় যে—শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট এক বৈঠকে মোসাদের এক প্রতিনিধির কাছে তাঁর নির্বাচনী প্রচারের অর্থায়নে সহায়তা চান এবং ১০ লাখ ডলার (১ মিলিয়ন ডলার) দাবি করেন। দিবোন লেখেন, ‘নির্বাচন সম্পর্কে বার্তাটি পরিষ্কার—শেষ পর্যন্ত তাঁর বিজয়ে আমাদেরও স্বার্থ রয়েছে, তাই আমাদের সহায়তা করা উচিত। তিনি ধরে নিয়েছেন, বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে আমরা বহিষ্কৃত হব, তা আমরা জানি।’ বিরোধী দল, যারা ১৯৭০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, নির্বাচনে জিতলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েলিদের বহিষ্কার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

প্রকাশিত তারবার্তাগুলোতে জয়াবর্ধনেকে নির্বাচনী অর্থায়ন দেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। তবে বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুরোধগুলো ইসরায়েল পূরণ করেছিল। ইসরায়েলি সামরিক সহায়তার গুরুত্ব স্পষ্ট হয় ১৯৮৭ সালের ২১ মে পাঠানো এক তারবার্তায়, যেখানে দিবোন প্রেসিডেন্টের সচিবের সঙ্গে বৈঠকের কথা জানান। ওই সচিব ‘পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি হতাশা প্রকাশ করেন, যারা নৈতিক বা বাস্তব কোনো সহায়তাই দেয়নি এবং বিশেষত সামরিক সহায়তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল আমরা—ইসরায়েলিরাই—তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছি।’ ১৯৮৮ সালের ৪ জানুয়ারির আরেকটি বার্তায় দিবোন লঙ্কান প্রেসিডেন্টের একটি চিঠি সংযুক্ত করেন, যেখানে প্রেসিডেন্ট ‘নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রে দেওয়া সহায়তার জন্য’ ইসরায়েলকে ধন্যবাদ জানান।

১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চের এক তারবার্তায় দিবোন জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন যে ‘এ পর্যন্ত আমরা যে সহায়তা দিয়েছি তা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমধর্মী।’ এমনকি প্রধানমন্ত্রী শামির নিজের দুইজন দেহরক্ষীকেও প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে পাঠিয়েছিলেন। দিবোন আবারও লেখেন, প্রেসিডেন্টের আশাবাদী মনোভাব তিনি বুঝতে পারছেন না এবং ভাবছেন এটি ‘বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার ফল, নাকি তিনি নিজের জনগণকে আরও ভালোভাবে বোঝেন।’

মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহতার প্রতিবেদন সত্ত্বেও সামরিক সহায়তা

গৃহযুদ্ধ চলাকালে শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে দেশটিতে অবস্থানরত ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের বারবার প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও এই বড় ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়। এসব প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয় যে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) দক্ষিণে তামিল আন্ডারগ্রাউন্ডের সদস্য সন্দেহে বহু তরুণকে ‘গুম’ করার জন্য দায়ী। সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বিচারে তামিল বেসামরিক নাগরিক, হাসপাতাল ও বাজারে বোমাবর্ষণ করেছে। ১৯৭১ সালের মতো বড় দমন অভিযানের আশঙ্কা তখনও ছিল। ৭১ সালে ১০ থেকে ২০ হাজার বিদ্রোহী লঙ্কান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষে নিহত হয়েছিল। মন্ত্রীরা ব্যক্তিগত মিলিশিয়া গঠন করছিলেন এবং অস্ত্র, যোগাযোগ ও নজরদারি সরঞ্জাম কিনছিলেন; তামিলদের ওপর নির্যাতনের খবর পাওয়া যাচ্ছিল; বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল; এবং সরকারি চাকরি থেকে তামিল কর্মচারীদের বরখাস্ত করা হচ্ছিল।

তামিল শিক্ষক ইউনিয়নের মহাসচিব এক বৈঠকে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের কাছে এমনকি দাবি জানান যে, তামিলদের নির্মূল করতে কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা থেকে ইসরায়েল বিরত থাকুক। ১৯৮৮ সালের ১২ জানুয়ারির এক বার্তায় দিবোন লেখেন, ‘প্রতিদিনই আমরা হত্যাকাণ্ড, খুন এবং গণহত্যার খবর শুনি’, বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর হাতে সংঘটিত ঘটনাগুলো।

শিকাগোয় ইসরায়েলের কনস্যুলেট জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে কার্যরত ‘শ্রীলঙ্কার তামিল সংখ্যালঘুদের গণহত্যা বন্ধের কমিটি’ দাবি করেছে যে—ইসরায়েল ‘সরকারি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে প্রশিক্ষণ দিতে অস্ত্র ও উপদেষ্টা পাঠিয়েছে।’ জবাবে কনস্যুলেট এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলে, ‘আবারও কিছু পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তৈরির চেষ্টা করছে।’ কিন্তু উপরে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র কমিটির দাবিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে।

ইসরায়েল শুধু মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপেক্ষা করেনি, শুরু থেকেই জানত যে—তাদের সামরিক সহায়তার সাফল্যের সম্ভাবনা সীমিত। ১৯৮৪ সালের নভেম্বরেই, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমহাপরিচালক আভি প্রিমোর এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তা প্রিমোরকে বলেন, ওয়াশিংটনের ধারণা শ্রীলঙ্কা সরকার তাদের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী সম্প্রসারণ করছে, কিন্তু ‘তারা নিজেদেরই বিভ্রান্ত করছে এই ভেবে যে সামরিক সমাধান সম্ভব।’ একইভাবে কলম্বোতে ইসরায়েলি স্বার্থ দপ্তরের প্রধান বারবার লিখেছিলেন যে প্রেসিডেন্ট জয়াবর্ধনে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।

তবু সামরিক সহায়তাই ছিল শ্রীলঙ্কা সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রধান কারণ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি জানা থাকা এবং সামরিকভাবে সংঘাত সমাধান অসম্ভব বলে স্পষ্ট মূল্যায়ন থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল সিদ্ধান্ত নেয় যে সহায়তা চালিয়ে যাওয়াই তাদের জন্য অধিকতর উপযোগী।

আলী লারিজানি: নিভৃতচারী দার্শনিক থেকে কট্টর রাজনীতিক হয়ে উঠেছিলেন যেভাবে

ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যা: আলোচনার পথ রুদ্ধ করার কৌশল ইসরায়েলের

ইরান ও ইউক্রেনের পর আরও এক যুদ্ধের মেঘ জমছে

সংঘ সমাজ বনেগা—আরএসএসের মুখোশ উন্মোচন

স্কুলে ভর্তিতে লটারি বাতিল: পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া

সব লঞ্চার ‘ধ্বংসের’ পরও এত ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে ছুড়ছে ইরান, আর কত অবশিষ্ট

পরিকল্পনায় তালগোল মার্কিন প্রশাসনের

এবার ইরানের ‘খারগ দ্বীপ’ চান ট্রাম্প, যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন পাহারায় জাহাজ চলাচল কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

বুমেরাং হয়েছে ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’