হোম > বিশ্লেষণ

ক্রমেই মোদির এক দলের শাসনের অধীনে চলে যাচ্ছে ভারত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর গেরুয়া শিবিরের আনন্দ মিছিল। ছবি: এএফপি

অর্থনৈতিক অসন্তোষ সাধারণত ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু ভারতে এখন সেই অসন্তোষই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে কাজ করছে। আর এই প্রবণতা ভারতকে ক্রমেই মোদির এক দল বিজেপির শাসনের অধীনে নিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ ধাপের বিধানসভা নির্বাচনে দুটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের ঘাঁটিতে ভোটাররা স্থানীয় শাসকদের সরিয়ে দিয়েছেন। এতে বিজেপি বড় ধরনের সুবিধা পেয়েছে, যাকে অনেকে ‘নির্বাচনী ভূমিকম্প’ হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কর্মসংস্থানের অভাবকে ঘিরে অর্থনৈতিক হতাশা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ওই দলগুলোর বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ ভোটারদের প্রভাবিত করেছে। এই দুই দলই দুই বছর আগে জাতীয় নির্বাচনে মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানানো বিরোধী জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল।

দক্ষিণের শিল্পোন্নত রাজ্য তামিলনাড়ুতে, যেখানে ভারতে সংযোজিত আইফোন তৈরি হয়, ভোটাররা পুরোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতাচ্যুত করে এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকার নতুন গড়া দলকে নির্বাচিত করেছেন। তিনি হাজার হাজার চাকরি তৈরি এবং বেকার স্নাতকদের মাসিক ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গকে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির মতাদর্শের বিরুদ্ধে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দুর্গ হিসেবে দেখা হতো। অথচ সেখানেই মোদির দল ভূমিধস জয় পেয়েছে। বিজেপির দিকে এই ঝুঁকে পড়ার পেছনে ছিল রাজ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা মুখ্যমন্ত্রী মমতার বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ক্ষয়ে যাচ্ছে এমন ধারণা। পাশাপাশি তাঁর দলের স্থানীয় কর্মীদের কঠোর ও প্রভাবশালী আচরণ নিয়ে ক্ষোভ। দুই বছর আগে এক ইন্টার্ন নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাতেও ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছিল। নিহত চিকিৎসকের মা বিজেপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং জয়ী হন।

পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল বিজেপির জন্য একধরনের আদর্শিক ‘ঘরে ফেরা’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ, হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের কয়েকজন ভিত্তিপ্রস্তর চিন্তাবিদ এই রাজ্য থেকেই উঠে এসেছিলেন। একই সঙ্গে পূর্ব ভারতে বিজেপির প্রভাব আরও সুসংহত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর পাশাপাশি ভোট হওয়া আসামেও বিজেপি নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাহুল ভার্মা বলেন, ‘বেঙ্গল তাদের রাজনৈতিক প্রকল্প ও আদর্শিক প্রকল্প দুটির জন্যই অত্যন্ত মূল্যবান একটি রাজ্য। এখন তারা দক্ষিণ ভারতের দিকে মনোযোগ ঘোরাতে পারবে, যা এখনো তাদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।’

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনো রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় নেই। স্থানীয় ভাষা ও পরিচয় নিয়ে প্রবল গর্ব এবং জাতপাতভিত্তিক সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনগুলো এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে উত্তর ভারতীয় ও হিন্দিভাষীদের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে পরিচিত বিজেপির জন্য ভিত্তি গড়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গেও আঞ্চলিক গর্ব দীর্ঘদিন বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এবার দলটি হিন্দু ভোটকে একত্র করতে সক্ষম হয়েছে। এর বড় একটি কারণ ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে ভয় উসকে দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে।

কলকাতাভিত্তিক সাংবাদিক এবং ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান নিয়ে লেখা বইয়ের লেখক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, ‘অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়ে মানুষের ক্ষোভ থাকলে ভোট বিভিন্ন দলের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ বিজেপির পক্ষে সমর্থনকে একত্র করেছে।’

পশ্চিমবঙ্গের এই জয় মোদি ও বিজেপির জন্য স্বস্তিদায়ক এক বড় প্রাপ্তি। কারণ, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় ফিরলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছিল। এর পর থেকে দলটি রাজ্য নির্বাচনে জোরালো প্রচার চালিয়েছে এবং একের পর এক রাজ্যে জয় পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বিতর্কিত স্থানীয় নির্বাচনগুলোর একটি ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পরাজিত দল তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের কয়েক মাস আগে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন মুসলিম ভোটারদের ওপর অসমভাবে প্রভাব ফেলেছে। কারণ, মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূলকে ভোট দিত।

এই নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট ভোটারের ১০ শতাংশের বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর কিছু ছিল দ্বৈত নাম বা মৃত ভোটারের কারণে। তবে অনেককে সফটওয়্যারের চিহ্নিত করা ‘যৌক্তিক অসামঞ্জস্যের’ কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। যেমন অস্বাভাবিক বড় পরিবার, কিংবা বাবা-মা ও সন্তানের বয়সের অসম্ভব ব্যবধান। এভাবে বাদ পড়া ভোটারদের বড় অংশই ছিলেন মুসলিম।

এই ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জ এখন আদালতে বিচারাধীন। বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, গত মাসে ভোট হওয়া অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও হওয়া তালিকা সংশোধন নির্বাচনের ফলে কোনো প্রভাব ফেলেছে। গত বছর শুরু হওয়া এই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার কারণে অস্বাভাবিকভাবে বেশি ভোট পড়েছে। যারা আগের নির্বাচনে ভোট দেননি বা নিজ রাজ্যের বাইরে থাকতেন, তারাও ছুটে এসে ভোট দিয়েছেন। কারণ, তাঁদের আশঙ্কা ছিল ভবিষ্যতে তাঁরা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন।

সাম্প্রতিক এই জয়গুলোর ফলে এখন ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৫টিতে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা ক্ষমতায়। আরও কয়েকটি রাজ্যে দলটি ক্ষমতাসীন জোটের অংশ। অন্যদিকে একসময়কার প্রভাবশালী ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিভক্ত। যদিও এপ্রিল মাসে ভোট হওয়া ছোট দক্ষিণি রাজ্য কেরালায় তাদের জোট জয় পেয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৯ সালের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন এখনো অনেক দূরে। তাই বিজেপির আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং ভারতে ধীরে ধীরে তীব্র হওয়া জ্বালানি সংকট বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উত্তর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে জ্বালানির দাম বাড়ায় কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। আগামী বছর যেখানে রাজ্য নির্বাচন হবে এবং যেখানে এক দশক ধরে বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে, সেই উত্তর প্রদেশেও গত মাসে সবচেয়ে তীব্র বিক্ষোভ দেখা গেছে।

রাহুল ভার্মা বলেন, ‘এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতীয় নাগরিকদের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ আরও বাড়বে। কেউই তাদের জয়কে নিশ্চিত বা স্থায়ী ধরে নিতে পারে না।’

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্ত—এর মানে কি ইরান যুদ্ধ শেষ

তামিলনাড়ুতে ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক সাফল্য কেন স্ট্যালিনকে বাঁচাতে পারল না

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে যেভাবে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ খেলেছে বিজেপি

বিজেপির ভোট প্রকৌশল যেভাবে ধসিয়ে দিল মমতার দুর্গ

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন: এসআইআর যেভাবে বদলে দিল ভোটের ফলাফল

পুতিনের নিরাপত্তা বাড়াতে তোড়জোড়—আড়ালে কী ঘটছে

রাখাইনে অপ্রতিরোধ্যই থাকছে আরাকান আর্মি, দীর্ঘায়িত হবে যুদ্ধ

ইরানের ১৪ দফা কি যুদ্ধ থামাতে পারবে

ভারতকে কেন ‘হাতি’ রূপে দেখাচ্ছে চীন—আড়ালে রাজনৈতিক চাল

ইরান যুদ্ধে কারা হারল, জিত কাদের