বাড়ির বারান্দায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছেন মৌসুমি মুর্মু। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে নিত্যদিনের চেনা শব্দ—বাসনকোসনের আওয়াজ, পায়ের শব্দ, পরিবারের মানুষের কথা। কিন্তু তাঁর ল্যাপটপের পর্দার দৃশ্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক নারীকে কয়েকজন পুরুষ চেপে ধরে রেখেছে। ক্যামেরা কাঁপছে, চিৎকারের শব্দ। ভিডিওটি এতটাই ভয়াবহ যে মৌসুমি গতি বাড়িয়ে দেখেন। তবু কাজের নিয়ম অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত ভিডিওটি তাঁকে দেখতে হয়।
ভারতের ঝাড়খন্ডের বাসিন্দা মৌসুমি মুর্মু (২৬) একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কনটেন্ট মডারেটর হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কাজ—স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত ছবি, ভিডিও ও লেখা শ্রেণিবদ্ধ করা, যাতে অ্যালগরিদম শিখতে পারে কোনটি সহিংসতা, কোনটি নির্যাতন বা ক্ষতিকর কনটেন্ট।
এক দিনে গড়ে তাঁকে ৮০০টিরও বেশি ছবি ও ভিডিও দেখতে হয়। এসব সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শেখায়—সহিংসতা ও নির্যাতন কীভাবে শনাক্ত করতে হয়।
এআই প্রযুক্তির সাম্প্রতিক অগ্রগতির পেছনে এই কাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এআই যতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে তাকে কী ধরনের তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। আর ভারতে এই কাজের বড় অংশই করছেন নারীরা—যাঁদের অনেক সময় বলা হয় ‘ঘোস্ট ওয়ার্কার’, অর্থাৎ অদৃশ্য শ্রমিক।
মৌসুমি বলেন, ‘প্রথম কয়েক মাস আমি ঠিকমতো ঘুমোতে পারতাম না। চোখ বন্ধ করলেই ওই দৃশ্যগুলো ভেসে উঠত।’
দুর্ঘটনার দৃশ্য, পরিবারের কাউকে হারানোর ছবি, পর্নো, এমনকি এমন এমন সব যৌন সহিংসতা—যেখান থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই। এসব তাঁকে তাড়া করত স্বপ্নেও। সেই সময় রাতে তাঁর মা জেগে উঠে পাশে বসে থাকতেন।
তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যগুলো আর আগের মতো ধাক্কা দেয় না। মৌসুমি বলেন, ‘আর অস্থির লাগে না, নিজেকে ফাঁকা লাগে। তবে মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন ফিরে আসে। তখনই বুঝি—এই কাজটা আমার ভেতরে একটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।’
গবেষকদের মতে, এই মানসিক অসারতা এবং পরে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া—কনটেন্ট মডারেটরদের একটি পরিচিত সমস্যা।
ডেটা ওয়ার্কার্স ইনকোয়ারি প্রকল্পের প্রধান ও সমাজবিজ্ঞানী মিলাগ্রোস মিসেলি বলেন, ‘কিছু মডারেটর হয়তো বড় ধরনের মানসিক ক্ষতি এড়িয়ে যেতে পারেন, কিন্তু তার কোনো প্রমাণ আমি এখনো পাইনি।’
তাঁর মতে, ‘ঝুঁকির দিক থেকে যেকোনো প্রাণঘাতী শিল্পের মতো কনটেন্ট মডারেশনকেও বিপজ্জনক কাজের মধ্যে ফেলতে হবে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, এই কাজে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেকের মধ্যে অতিরিক্ত সতর্কতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা দেখা দেয়।
গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণায় (যেখানে ভারতের কর্মীরাও ছিলেন) দেখা গেছে, এই কাজের ক্ষেত্রে ট্রমাটিক স্ট্রেসই সবচেয়ে বড় মানসিক ঝুঁকি। এমনকি যেখানে সহায়তার ব্যবস্থা ছিল, সেখানেও ট্রমা রয়ে গেছে।
ভারতের তথ্য প্রযুক্তি এবং বিপিও শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান নাসকমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালেই ভারতে আনুমানিক ৭০ হাজার মানুষ ডেটা অ্যানোটেশনের কাজে যুক্ত ছিলেন। সে সময় এ খাতের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২৫ কোটি ডলার। এর প্রায় ৬০ শতাংশ আয় আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, ভারতের অংশ ছিল মাত্র ১০ শতাংশ।
এই শ্রমিকদের প্রায় ৮০ শতাংশই গ্রামীণ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। কম ভাড়া ও কম মজুরি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট শহর ও মফস্বলে এসব কাজ পরিচালনা করে। আর ইন্টারনেট সুবিধা থাকায় গ্রাম থেকেই এসব কাজে যুক্ত হচ্ছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীরা।
এই কর্মশক্তির অর্ধেক বা তার বেশি নারী। প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণা—নারীরা বেশি মনোযোগী, নির্ভরযোগ্য এবং ঘরে বসে বা চুক্তিভিত্তিক কাজ সহজেই করতে পারেন। আর নারীদের জন্য গ্রাম থেকেই এটি আয়ের এক বিরল সুযোগ। কর্মীদের বড় অংশই দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের। কৃষিকাজ বা খনিতে কাজের তুলনায় এই কাজ পরিচ্ছন্ন ও তুলনামূলক ভালো বেতনের হওয়ায় অনেকের কাছে এটি স্বাবলম্বী হওয়ারও একটি পথ।
গবেষক প্রিয়ম ভাদালিয়া মনে করেন, ঘরে বসে কাজ করার সুবিধা প্রান্তিক নারীদের অবস্থান দৃঢ় করে। তিনি বলেন, এই কাজকে ‘সম্মানজনক’ হিসেবে দেখানো হয়। ফলে এই কাজে জড়িত শ্রমিকেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কৃতজ্ঞ থাকে, যা তাদের মানসিক ক্ষতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পথ বন্ধ করে দেয়।
রাইনা সিং (ছদ্মনাম) ২৪ বছর বয়সে এই কাজে যুক্ত হন। শিক্ষকতা করতে চাইলেও আগে তাঁর পারিবারিক সচ্ছলতার প্রয়োজন ছিল। উত্তর প্রদেশের বেরেলিতে নিজের ঘর থেকেই তিনি এই কাজ শুরু করেন। বেতন ছিল মাসে প্রায় ৩৩০ পাউন্ড (প্রায় ৪১ হাজার রুপি)। প্রথম দিকে কাজ ছিল সাধারণ—স্প্যাম বা প্রতারণামূলক লেখা শনাক্ত করা।
রাইনা বলেন, ‘শুরুতে ভয়ের কিছু মনে হয়নি। একঘেয়ে ছিল, কিন্তু রোমাঞ্চও ছিল। মনে হতো, এআইয়ের ভেতরের কাজটা আমি দেখছি।’
কিন্তু ছয় মাস পর কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই তাঁকে প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদন প্ল্যাটফর্ম-সংক্রান্ত প্রকল্পে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর কাজ হয় শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণ।
রাইনা বলেন, আমি কখনো ভাবিনি এটা আমার কাজের অংশ হবে। আপত্তি জানালে ব্যবস্থাপক বলেন, ‘মনে করো এটা একটা মহৎ কাজ। তুমি শিশুদের রক্ষা করছ।’ এরপর তাঁকে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট শ্রেণিবদ্ধ করার কাজে লাগানো হয়।
‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কতগুলো পর্নো দেখেছি—গুনে শেষ করা যাবে না,’ বলেন রাইনা।
কিন্তু এর প্রভাব পড়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে। রাইনা বলেন, ‘যৌনতার ধারণাটাই আমার কাছে বিরক্তিকর হয়ে যায়। চাকরি ছাড়ার এক বছর পরও আমার মধ্যে এর প্রভাব থেকে যায়।’
ভারতের আটটি ডেটা ও কনটেন্ট মডারেশন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটি মানসিক সহায়তা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। বাকিরা বলছে, কাজটি মানসিকভাবে ততটা চাপের নয়।
প্রিয়ম ভাদালিয়ার বলেন, ‘যেখানে সহায়তা আছে, সেখানেও শ্রমিককে নিজে গিয়েই সেটা চাইতে হয়। কিন্তু অনেক কর্মীর হয়তো নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা নেই। আর ভারতের শ্রম আইনে মানসিক ক্ষতির স্বীকৃতি না থাকায়, এসব কর্মী কার্যত সুরক্ষাহীন।’
কঠোর নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের (এনডিএ) কারণে শ্রমিকেরা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গেও কাজের কথা বলতে পারেন না। নিয়ম ভাঙলে চাকরি বা আইনি ঝুঁকিও রয়েছে।
মৌসুমির ভয় ছিল, তাঁর পরিবার যদি জানে তিনি কী কাজ করেন, তবে হয়তো তাঁকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। মাসে প্রায় ২৬০ পাউন্ড (প্রায় ৩২ হাজার রুপি) বেতনের চাকরিতে আর চার মাস বাকি। মানসিক স্বাস্থ্যের কথা তুললে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তাঁকে চুপ থাকতে বাধ্য করছে।
দুশ্চিন্তা সামলাতে তিনি বনে বনে হাঁটেন, খোলা আকাশের নিচে বসে থাকেন। কখনো পাথর কুড়ান, কখনো দেয়ালে নকশা আঁকেন।
মৌসুমি বলেন, ‘এতে সত্যিই সবকিছু ঠিক হয় কি না জানি না। তবে একটু ভালো লাগে।’
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা