হোম > বিশ্লেষণ

ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের নাম পরিবর্তন: ভারতের ওপর ভরসা কমাচ্ছেন ট্রাম্প?

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এএফপি

এ সপ্তাহে এক বিস্ময়কর পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ঘোষণা দিয়েছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড (INDOPACOM) তার পুরোনো নাম প্যাসিফিক কমান্ডে (PACOM) ফিরে যাবে। হাওয়াইয়ে সদর দপ্তর থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর এই কমান্ড প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের পূর্বাংশে মার্কিন কার্যক্রম তদারক করে। পেন্টাগনের যুক্তি, ‘USPACOM নামের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা কমান্ডটির গভীর ঐতিহাসিক শিকড়কে সম্মান জানায় এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারী সবার মধ্যে গর্ব ও সম্মিলিত চেতনা জাগিয়ে তোলে।’

নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে এটা সত্য হতে পারে। তবে সমানভাবে এটাও সত্য যে পুরোনো নামে ফিরে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও আরও বেশি স্বস্তিদায়কভাবে মিলে যায়। ট্রাম্পের সেই আকাঙ্ক্ষা হলো, তিনি চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিয়ে সম্পৃক্ততা ও চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিতে চান।

মজার বিষয় হলো, ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই প্যাসিফিক কমান্ডের নাম বদলে ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড করা হয়েছিল। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সে সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস বলেছিলেন, নতুন নামটি ‘ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সংযোগকে’ প্রতিফলিত করে। তবে এই পরিবর্তনে কমান্ডের ভৌগোলিক দায়িত্ব ক্ষেত্র বদলায়নি। সেটি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে ভারতের উপকূলঘেঁষা জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত। সাবেক কমান্ডার হ্যারি হ্যারিস একে রসিকতা করে বলতেন, ‘হলিউড থেকে বলিউড।’

তবে নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদের ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ (Free and Open Indo-Pacific) ধারণাকে আরও জোরালো করা হয়েছিল। ট্রাম্প ২০১৭ সালে ভিয়েতনাম সফরের সময় প্রথম এই ধারণা তুলে ধরেন। পরে সেটিই যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কৌশলে পরিণত হয়। এই ভাবনার উৎস ছিলেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। তাঁর ধারণা ছিল অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করবে, যাতে কর্তৃত্ববাদী চীন দক্ষিণ চীন সাগরকে ‘বেইজিং হ্রদে’ রূপান্তর করতে না পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাটি শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়ার উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলারও প্রতীক ছিল। পরিকল্পনাটি এমন ছিল যে বেইজিংকে তার মনোযোগ ও সম্পদের একটি অংশ তাইওয়ান, পূর্ব চীন সাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে সরিয়ে অন্যদিকে ব্যয় করতে বাধ্য করা যায়।

শেষ পর্যন্ত চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রভাবকে ভারসাম্যে রাখার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ কৌশলগত কাঠামোর কেন্দ্রীয় ধারণায় পরিণত হয় ইন্দো-প্যাসিফিক। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে আবার প্যাসিফিক কমান্ডে নাম ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ভিন্ন এক বার্তা দিচ্ছে। এটি চীনের আঞ্চলিক লক্ষ্য মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত না-ও হতে পারে, তবে অন্তত সেই কৌশলগত যুক্তি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়, যার ভিত্তিতে ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা গড়ে উঠেছিল।

মূলত ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড নামকরণে প্রতিফলিত হয়েছিল ওয়াশিংটনের এই বিশ্বাস যে চীনের উত্থানকে ভারসাম্যে রাখতে ভারত একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ানো, নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা এবং পূর্ব আফ্রিকা থেকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত সমমনাদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো।

লক্ষ্য ছিল কেবল পূর্ব এশিয়ায় নয়, বহু ভৌগোলিক ক্ষেত্রজুড়ে চীনা প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করা। কিন্তু আজ এসব ধারণা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে আর আগের মতো নেই বলেই মনে হচ্ছে। ভারত এখনো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চিন্তায় দেশটি আগের মতো বিশেষ মর্যাদা আর পাচ্ছে না।

গত গ্রীষ্ম থেকে ট্রাম্প দেখিয়েছেন যে অন্য লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি ভারতের সঙ্গে গুরুতর উত্তেজনার ঝুঁকিও নিতে প্রস্তুত। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের যুদ্ধের পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি তা সমাধানে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন না করায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত রুশ তেল কেনা নিয়ে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে মতবিরোধেও ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এমনকি ওই বছর ভারত আয়োজন করতে যাওয়া কোয়াড সম্মেলনে অংশগ্রহণও তিনি বাতিল করেছিলেন বলে জানা যায়, যা নয়াদিল্লির জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে। ট্রাম্প একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ করেছেন, যদিও ইসলামাবাদের সঙ্গে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতিতে ট্রাম্প পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এতে এমন সময়ে ইসলামাবাদের গুরুত্ব বেড়েছে, যখন নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই টানাপোড়েনের দিকে গেছে।

প্যাসিফিক কমান্ডে পুনরায় ফেরত যাওয়া সিদ্ধান্তটি আবার এমন এক সময় এল, যখন গত মাসে ট্রাম্পের বহুল আলোচিত বেইজিং সফর শেষ হয়েছে। ওই সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন। এর আগে কয়েক মাস ধরে শুল্ক, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং ইরান ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সামনে না এনে ট্রাম্প জোর দেন সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে। এর মধ্যে ছিল বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।

দুই নেতা সফরটিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরারম্ভের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেন। এতে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নেতা-নেতাভিত্তিক কূটনীতির ধারা আবার ফিরে এসেছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। যদিও বড় ধরনের মতপার্থক্য এখনো অমীমাংসিত, তবু বেইজিং বৈঠক এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে যে ট্রাম্প ক্রমেই চীনের উত্থান ঠেকাতে আঞ্চলিক জোট গঠনের বদলে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও লেনদেনভিত্তিক সমঝোতাকেই বেশি পছন্দ করছেন।

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্যাসিফিক কমান্ড নামে ফিরে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের চীননীতি থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর গুরুত্ব কমিয়ে আনার বৃহত্তর প্রচেষ্টার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়। যদিও কর্মকর্তারা এখনো মাঝেমধ্যে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণা ব্যবহার করেন, প্রশাসনের ভাষায় ক্রমেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্যের ওপর জোর বাড়ছে। বিপরীতে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যেটি তিনি নিজেই এগিয়ে নিয়েছিলেন সেই জোটভিত্তিক ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর গুরুত্ব কমে এসেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত মাসে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক শাংগ্রি-লা ডায়ালগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তাঁর বক্তব্যে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটি ব্যবহারই করেননি। এই বিচারে ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড নাম পরিত্যাগ করা হয়তো ভৌগোলিক বিষয় নয়, বরং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রতীক। এই পদক্ষেপ এমন এক প্রশাসনের ইঙ্গিত দেয়, যারা দীর্ঘমেয়াদি জোট গঠনের মাধ্যমে চীনকে ভারসাম্যে রাখার চেয়ে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণে লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

নিশ্চয়ই প্যাসিফিক কমান্ডের নাম পুনঃপ্রতিষ্ঠা সামরিক অভিযান, বাহিনীর অবস্থান কিংবা কমান্ডের দায়িত্বক্ষেত্র বদলে দেবে না।

কিন্তু কৌশলগত পরিসরে নাম কেবল নাম নয়। ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার ভেতরে ছিল ভারতকে একটি কেন্দ্রীয় অংশীদার হিসেবে দেখা, জোট গঠনকে শক্তির উৎস হিসেবে গণ্য করা এবং চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতাকে এই শতাব্দীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা। কিন্তু প্যাসিফিক কমান্ড নাম পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ট্রাম্প হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ওয়াশিংটনের কৌশলগত চিন্তাকে এখন আর সেই ধারণাগুলো আগের মতো পরিচালিত করছে না।

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ট্রাম্পের ইউ-টার্নে নেতানিয়াহুর অজেয় ও গ্রেটার ইসরায়েলের স্বপ্নে ফাটল

আরও শক্তিশালী ইরান, প্রতিদ্বন্দ্বী তেহরানের দিকেই ঝুঁকছে উপসাগরীয় দেশগুলো

৪৭ বছরের বৈরিতা: অবশেষে যেভাবে চুক্তিতে পৌঁছাল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে কারা

৩ নাবিকের মৃত্যু, পচন ধরা লাশ: উপসাগরীয় সংঘাতের কোলাটেরাল ড্যামেজ ভারতীয় নাবিকেরা

রাজনীতির যৌনকরণ: ভারতে মুসলিম নারীদের লক্ষ্যবস্তু করতে যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এআই

বিজেপিতে না গিয়ে কেন ‘অস্তিত্বহীন’ দলে ভিড়ছেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা

ব্রেক্সিটের বর্ষপূর্তিতে ইইউতে ফেরার দাবি জোরদার, তবে পথ কতটা কঠিন

মার্কিন হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর পর ট্রাম্প-মোদি সম্পর্ক নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে

গাজা গণহত্যা: বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, ইসরায়েলের ৮০ বছরের পরিকল্পনার ফসল

যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও সুদের চাপ: সংকটের মধ্যেও বিশ্ববাজারে কেন কমছে সোনার দাম