ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত রুশ বিমানশক্তি, গোয়েন্দা ও যুদ্ধকৌশল এখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কাজে লাগছে। এর ফলে ৬ বছরে পড়া গৃহযুদ্ধে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারছে। মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব চীনের। চীন–মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে থাকা শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপরও চীনের প্রভাব আছে। তবে রাশিয়ায় তৈরি যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে বড় সুবিধা দিয়েছে এবং দিচ্ছে।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস–ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং ‘পুতিনস রাশিয়া অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া’—বইয়ের লেখক ইয়ান স্টোরির মতে, মস্কো এখন মিয়ানমার সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার। তিনি বলেন, রুশ অস্ত্র মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যবহার করে বিদ্রোহীদের পাশাপাশি বেসামরিক স্থাপনাতেও ‘ভয়াবহ প্রভাব’ ফেলেছে। স্কুল ও হাসপাতালও হামলার শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর সংখ্যা ভয়াবহ।’
প্রযুক্তি ও অস্ত্রের বাইরে মিয়ানমারের জেনারেলরা রাশিয়ার তথাকথিত ‘মিট অ্যাসল্ট’ কৌশলও গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে। এতে শত্রুর প্রতিরক্ষা লাইনের দিকে বারবার বিপুল সংখ্যক পদাতিক সেনা পাঠানো হয়, হতাহতের বিষয়টি প্রায় উপেক্ষা করা হয়। ২০২৪ সালে চালু হওয়া বাধ্যতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে সেনা সংখ্যা প্রায় ১ লাখ বেড়েছে বলে জানা গেছে। এই কৌশলের জন্য যে বিপুল সংখ্যক সৈন্য দরকার, তা এতে পাওয়া গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধে এই পদ্ধতি প্রথম আলোচনায় আসে।
স্টোরি বলেন, ‘জান্তা রাশিয়ার কৌশল নকল করেছে। বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ পাওয়া সৈন্যদের মানবঢেউ আক্রমণে ব্যবহার করা হচ্ছে।’
মস্কো–মিয়ানমার ঘনিষ্ঠতা
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করে। এর ফলে চলমান গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এক বছর পর রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা এই দুই দেশ এরপর আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ক্রেমলিন প্রথম দিকেই অভ্যুত্থান নেতা সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। সামরিক শাসিত মিয়ানমারই দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার একমাত্র দেশ, যারা প্রকাশ্যে ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধকে সমর্থন করে এবং সামরিক সহায়তাও দেয়। জানা গেছে, তারা মর্টারের গোলা ও ট্যাংকের লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে।
স্টোরির বই অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শুরুর দিকে ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিরিলো বুদানভ জানান, ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাতে সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণে রাশিয়া রুশ অস্ত্র ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাছে সামরিক সরঞ্জাম চেয়েছিল। এর মধ্যে মিয়ানমারও ছিল। কয়েক মাস পর স্টোরি লেখেন, রাশিয়ার ট্যাংক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান উরালভাগনজাভোদ মিয়ানমার থেকে অপটিক্যাল লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আমদানি করে। এগুলো দিয়ে সংরক্ষণে থাকা পুরোনো টি–৭২ ট্যাংক আধুনিকীকরণ করে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
এরপর দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ চুক্তি সই হয়েছে। রাশিয়ার সহায়তায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০ বছর পর সরাসরি বিমান চলাচলও আবার শুরু হয়েছে। তবে সম্পর্কের কেন্দ্রে এখনো অস্ত্রই রয়েছে। রাশিয়া মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে গোলাবারুদ, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে। সংঘাত পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডি বলছে, এসব ব্যবহার করে সেনাবাহিনী প্রতিপক্ষ ও বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ক্রমেই বেশি সহিংস অভিযান চালাচ্ছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে গৃহযুদ্ধে অন্তত ৯৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
স্টোরি জানান, রাশিয়ার তৈরি ছয়টি সুখোই সু–৩০ যুদ্ধবিমান এখন সামরিক সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী আকাশযান। এর শেষটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পৌঁছায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রুশ কর্মীরা মিয়ানমারে এসব বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ করছেন।
জাতিসংঘ বলছে, মিয়ানমারে বেসামরিক হতাহতের প্রধান কারণ এখন বিমান হামলা। ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় বিমান হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫২ শতাংশ বেড়েছে। এসিএলইডি জানায়, ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৩ মার্চ পর্যন্ত ৫ হাজার ৯১২টি বিমান হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে অন্তত ৪ হাজার ৮৬৫ জন নিহত হয়েছে। একই সময়ে ৯৩১টি ড্রোন হামলায় অন্তত ৩৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ মাসের শুরুতে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা কারেন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জানায়, ইয়াঙ্গুনের উত্তর–পূর্বে বাগো অঞ্চলে সরকারি বাহিনী অন্তত ৩০ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করেছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। পাঁচজন ছাড়া বাকিরা বিমান হামলায় মারা যায়। পরে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদেরও স্থলবাহিনী হত্যা করেছে বলে অভিযোগ। কয়েক দিন পর রাখাইন রাজ্যের একটি বন্দিশিবিরে বিমান হামলায় অন্তত ১১৬ জন যুদ্ধবন্দী নিহত এবং আরও ৩২ জন আহত হয় বলে আরাকান আর্মি জানিয়েছে। এটি চলমান সংঘাতের অন্যতম ভয়াবহ হামলা। এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সাগাইং অঞ্চলের একটি গ্রামে বোমা হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।
গত বছর সামরিক সরকার রাশিয়ার নতুন এমআই–৩৮টি আক্রমণ-পরিবহন হেলিকপ্টারের প্রথম বিদেশি ক্রেতা হয়। স্টোরির মতে, রাশিয়া সরবরাহ করা অন্যান্য রোটরক্রাফটের সঙ্গে এসব হেলিকপ্টার মিয়ানমারের বাহিনীকে হামলা চালাতে এবং দ্রুত সেনা মোতায়েন করতে সাহায্য করছে।
‘সন্ত্রাসের কৌশল’
সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো শুরুতে ড্রোন ব্যবহারে এগিয়ে ছিল। কিন্তু পরে ড্রোন যুদ্ধে জান্তা সরকার অনেকটাই এগিয়ে যায়। রাশিয়া মিয়ানমারকে নজরদারি, যুদ্ধ এবং আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থির-ডানা বিশিষ্ট অ্যালব্যাট্রস–এম ৫ মনুষ্যবিহীন বিমান, অপটিক্যাল ও তাপীয় ক্যামেরাসহ ১৬ ঘণ্টা আকাশে থাকতে সক্ষম অরল্যান–১০ই এবং কামিকাজে ধরনের ভিটি–৪০ ড্রোন। এই ড্রোনটির নামকরণ করা হয়েছে রাশিয়াপন্থী ওয়ার ব্লগার ভ্লাদেন তাতারস্কির নামে, যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছিলেন।
স্টোরি বলেন, এসব সামরিক মানের ড্রোন প্রযুক্তিগতভাবে বিদ্রোহীদের ব্যবহৃত বাজারে সহজলভ্য বাণিজ্যিক ড্রোনের চেয়ে অনেক উন্নত। রাশিয়া সরবরাহ করা অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা সহজেই বিদ্রোহীদের ড্রোন শনাক্ত করে নিষ্ক্রিয় করতে পারে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের ড্রোন শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপও দিয়েছে। ২০২৪ সালে তারা একটি পৃথক ড্রোন যুদ্ধ অধিদপ্তর গঠন করে। এরপর বিশেষায়িত ড্রোন প্রশিক্ষণ ইউনিট মোতায়েন করা হয়, যেগুলো বিদ্যমান সামরিক ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এতে বোঝা যায়, ড্রোন যুদ্ধ এখন প্রচলিত সামরিক অভিযানের কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে উঠেছে।
পশ্চিম মিয়ানমারের চিন রাজ্যে, চিন ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব অলিভিয়া থাওং লুয়াই দেখেছেন, সামরিক বাহিনীর হামলার ধরন বদলে গেছে এবং এতে এখন মানবহীন আকাশযুদ্ধ যুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ড্রোন হামলা বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যাঞ্চলের শুষ্ক এলাকায় গাইরোকপ্টার এবং মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডার বা প্যারামোটর দিয়ে হামলাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার মতে, জেট জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রয়োজনের কারণে আংশিকভাবে এই পরিবর্তন এসেছে। তিনি আরও বলেন, ‘তবে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের কৌশল একই রয়ে গেছে।’
চিন রাজ্যের সাবেক রাজধানী ফালাম শহরের আশপাশে তীব্র লড়াই হয়েছে। একটি ফ্রন্টলাইন সূত্রের মতে, কৌশলগত এই শহর পুনর্দখলের জন্য সামরিক বাহিনী এক হাজারের বেশি সৈন্য মোতায়েন করেছে। শহরটি পুনর্দখলের জন্য পাঠানো প্রায় ৪৫০ জন সরকারি সৈন্যের প্রথম বহরটি চিনের সরকারবিরোধী বাহিনীর হামলায় থেমে যায়। এরপর একই রুট ধরে ছোট ছোট ইউনিটে ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা চালানো হয়। প্রতিবারই সেনারা ভারী ক্ষতির মুখে পড়ে। লক্ষ্যস্থলের দিকে দলবদ্ধভাবে অগ্রসর হওয়ার সময় ডজনখানেক সৈন্য নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়।
সামনের সারিতে পাঠানো বেশিরভাগ সৈন্যই নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ছিল। হতাহতের সংখ্যা বাড়লেও বারবার নতুন সৈন্য পাঠানো হয়েছে। এলাকা থেকে পাওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যর্থ হামলার পর একটি পাহাড়চূড়ার ট্রেঞ্চে সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে সরকারি সৈন্যদের মরদেহ। অন্যদিকে, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোও বড় ও শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কৌশল শিখতে ইউক্রেনের অভিজ্ঞতার দিকে তাকাচ্ছে।
ফাইবার-অপটিক ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোন, যা ইউক্রেনের যুদ্ধে বড় পরিবর্তন এনেছে, এখন বিদ্রোহীদের জন্য সম্ভাব্য কার্যকর অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাংককভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিসের মতে, এসব ড্রোনের মাধ্যমে বিদ্রোহীরা প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর থেকে শাসক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। সাধারণ রেডিও-নিয়ন্ত্রিত এফপিভি ড্রোনের বিপরীতে, ফাইবার-অপটিক ড্রোন ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ে প্রভাবিত হয় না এবং রাশিয়া সরবরাহ করা অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থাও এড়িয়ে যেতে পারে বলে ডেভিস জানান। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে কিছু বিরোধী বাহিনী এই প্রযুক্তি পরীক্ষা করে ভালো ফল পেয়েছে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, বিদ্রোহীরা কি নিরাপদ ও বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে কি না? কারণ, হাজার হাজার ড্রোন তৈরি ও ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ সংগ্রহ ও সংযোজন প্রয়োজন, যা যুদ্ধের গতিপথ বদলাতে পারে। ডেভিস বলেন, ‘ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এর মানে হলো যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার ড্রোন এবং সেগুলো পরিচালনায় প্রশিক্ষিত ছোট ইউনিট মোতায়েন করা। কিন্তু শুরুতে খণ্ড খণ্ডভাবে এগোলে তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবে।’
আরও গভীর হচ্ছে জোট
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং রাশিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু গত ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদো সফর করেন। সামরিক বাহিনী আয়োজিত নির্বাচনের পর তিনি ছিলেন প্রথম উচ্চপদস্থ বিদেশি কর্মকর্তা যিনি দেশটি সফর করেন। ওই নির্বাচনকে সামরিক শাসনকে শক্তিশালী করার ভাঁওতাবাজি হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করা হয়েছিল।
সফরের সময় দুই দেশ চার বছরের একটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি সই করে। এটি মস্কো ও নেপিডোর ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার নতুন প্রমাণ। এর আগে গত বছর রাজধানীতে রাশিয়া একটি স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ কেন্দ্র স্থাপন করেছিল।
স্যাটেলাইট কেন্দ্র ও নজরদারি ড্রোন মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে সেনাবাহিনী আরও স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছে। সমুদ্রেও সহযোগিতা বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যৌথ নৌ মহড়া মিয়ানমারের বাহিনীকে সমুদ্রপথে রসদ সরবরাহ, নৌ অবতরণ এবং উপকূলের বাইরে থেকে গোলাবর্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
সম্পর্ক এখন মহাকাশ খাতেও বিস্তৃত হয়েছে। গত মাসে রাশিয়া ঘোষণা দেয়, তারা মিয়ানমারের প্রথম মহাকাশচারী নির্বাচন ও প্রশিক্ষণে সহায়তা করবে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাবেক চিকিৎসক এবং ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার কর্মকর্তা পিয়ারে ছদ্মনামে বলেন, ২০১৫ সালে তিন বছরের প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে পাঠানো হয় তাঁকে। ২০১৮ সালের মধ্যে প্রায় ৬০০ মিয়ানমার কর্মকর্তা রাশিয়ার সামরিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন বলে মস্কোর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা তাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০২১ সালের মার্চে পিয়ায়ে সেনাবাহিনী থেকে বের হয় যান হয়ে যান। এখন তিনি মিয়ানমার ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট নামে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের গঠিত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি এখনও মিয়ানমারের কর্মরত সেনাদের একটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তাঁর মতে, সেখানে থেকে আসা তথ্য বলছে রাশিয়ান প্রশিক্ষকেরা রাশিয়ান সরঞ্জাম ও বিমান রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার শেখাতে ‘ব্যাপক’ সংখ্যায় কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন খবরও পাচ্ছি যে সামনের সারির কাছে চীনা ও রাশিয়ান ড্রোন প্রশিক্ষকদের দেখা গেছে।’ তাঁর মতে, রাশিয়া মিয়ানমারকে খুব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার হিসেবে দেখে না। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু এমন একটি দেশ, যাকে তারা ব্যবহার ও শোষণ করতে পারে।’
এই সম্পর্ক থেকে মস্কো নিয়মিত অস্ত্র বিক্রির আয় পাচ্ছে। পশ্চিমা সরবরাহকারীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় মিয়ানমার এখন রাশিয়ার অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পাশাপাশি রাশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাবও অর্জন করেছে। পিয়ায়ের মতে, রাশিয়ার সহায়তা না থাকলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘এখনই হার মানত।’
মস্কোর ক্যালকুলাস
সিঙ্গাপুরভিত্তিক আইএসইএএস–ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউট-এর গবেষক স্টোরি বলেন, মিয়ানমারে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো সামরিক ও জ্বালানি রপ্তানির বাজার ধরে রাখা এবং পশ্চিমকে দেখানো যে কূটনৈতিকভাবে তাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ‘মিয়ানমারের বন্ধুত্ব রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে তারা পশ্চিমকে দেখাতে পারে যে তাদের বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার প্রশ্নে মস্কো ও বেইজিং এক অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনো পক্ষই চায় না যে জান্তা পরাজিত হয়ে তার জায়গায় পশ্চিমমুখী সরকার আসুক।’
তবে মিত্রদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে রাশিয়ার রেকর্ড দুর্বল। সিরিয়ায় তারা বাশার আল‑আসাদ-এর সরকারের পতন ঠেকাতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েল-এর চাপের মুখে ভেনেজুয়েলা বা ইরান-কেও তেমন অর্থবহ সহায়তা দেয়নি, বিশেষ করে তেহরানের নেতৃত্বের ওপর চলমান হামলার ক্ষেত্রে। স্টোরি সন্দেহ প্রকাশ করেন, মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্ব অস্তিত্বের সংকটে পড়লে মস্কো ভিন্ন আচরণ করবে কি না। ২০২৩ সালের শেষ দিকে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট বড় ধরনের আক্রমণ চালিয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘তারা শুধু সরে যাবে।’ পিয়ায়ে বলেন, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো রাশিয়ার মতো কোনো বাহ্যিক সহায়তা পাচ্ছে না। তাঁর কথায়, ‘দুঃখের বিষয় হলো, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে আমাদের যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা মিলছে না।’ তিনি আরও বলেন, সামরিক শাসন টিকিয়ে রাখার মানবিক ক্ষতির জন্য মস্কো আংশিকভাবে দায়ী।
“এটা আমাকে সব সময় ক্ষুব্ধ করে। আমাদের মানুষের প্রাণহানির জন্য আমি সব সময় তাদের দায়ী করব। ”