সারা বিশ্বে যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান, তখন আফগানিস্তানের নারী সাংবাদিকেরা যাপন করছেন মানবেতর জীবন।
২০২১ সালের আগস্ট মাসের আগেও আফগানিস্তানের গণমাধ্যম ছিল প্রাণবন্ত। টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠত সংবাদ পাঠিকাদের মুখ, রেডিওতে ভেসে আসত নারীদের কণ্ঠস্বর। শুধু তা-ই নয়, মাঠপর্যায়ে থাকা নারী সাংবাদিকেরা তুলে ধরতেন সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প। কিন্তু সময় বদলে গেছে।
গত পাঁচ বছরের কম সময়ে আফগান গণমাধ্যমের সেই চেনা ছবি আজ ধূসর। কড়া পোশাক বিধি আর লৈঙ্গিক বৈষম্যের বেড়াজালে পড়ে আফগানিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো এখন প্রায় নারীশূন্য। সেখানে নারীদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা নেই। যেখানে একসময় নারীরা সংবাদ তৈরি করতেন, আজ তাঁরা নিজেরাই সংবাদের করুণ শিরোনাম। আফগান নারী সাংবাদিকদের এই স্তব্ধ হয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর বিশ্বকে এক বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
গণমাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, আফগানিস্তানে নারী সাংবাদিকদের এই অনুপস্থিতি শুধু একটি পেশার সংকট নয়। এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত। অনেক স্বাধীন গণমাধ্যম বন্ধ হয়ে গেছে অথবা দেশে কার্যক্রম গুটিয়ে তারা এখন বিদেশ থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের ভেতরে যাঁরা এখনো কাজ করছেন, তাঁরা চলছেন চরম সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে।
আগে সংবাদকক্ষে নারীদের উপস্থিতি সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখত, বিশেষ করে নারীদের সমস্যাগুলো জোরালোভাবে সামনে আসত। কিন্তু এখন সেসব বিষয় প্রচার করা প্রায় নিষিদ্ধ। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’-এর ২০২৬ সালের সূচক অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে আফগানিস্তানের অবস্থান ১৭৫তম। দেশটির সংবাদমাধ্যমের এই দৃশ্যমান মৃত্যুতে বেশি সংকটে পড়েছেন নারী সাংবাদিকেরা। কয়েকটি প্রদেশে রেডিওতে নারীদের কণ্ঠ প্রচার করাও আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আফগানিস্তান জার্নালিস্ট সেন্টার এবং আফগানিস্তান মিডিয়া সাপোর্ট অর্গানাইজেশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক বছরে সংবাদকর্মীদের ওপর অন্তত ১২৭টি হুমকি এবং ২০টি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। ১০টি গণমাধ্যম সংস্থার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। স্বাধীন গণমাধ্যমগুলো এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময় পার করছে।
আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে ওঠে সেখানকার নারী সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত গল্পগুলোতে। সম্প্রতি ‘রুখশানা মিডিয়া’র সঙ্গে কথা বলেছেন আফগানিস্তানের কয়েকজন নারী সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ২৯ বছর বয়সী মালিহা। তিনি পাঁচ বছর টেলিভিশন ও রেডিওতে কাজ করেছেন। একসময় মাঠপর্যায়ে গিয়ে নারীদের গল্প তুলে ধরতেন। কাবুল পতনের পর তাঁর কর্মস্থল বন্ধ হয়ে যায়। এক বছর ধরে বিভিন্ন অফিসে ঘুরেও চাকরি পাননি তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতা হলো, যোগ্যতা থাকলেও নিয়োগদাতারা পুরুষদের প্রাধান্য দিচ্ছেন। কারণ, নারীরা এখন অনেক জায়গায় যেতে পারেন না। একসময়ের সাংবাদিক মালিহা তাঁর স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে একটি অন্ধকার বেসমেন্টে বসে এখন দরজির কাজ করছেন। যেখানে তাঁর হাতে মাইক্রোফোন থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ তিনি চালাচ্ছেন সেলাই মেশিন।
প্রায় ৯ বছর আফগানিস্তানে সাংবাদিকতা করেছেন মাহবুবা। সহকর্মীদের গ্রেপ্তার আর কর্মস্থল বন্ধ হওয়ার পর নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এখন তিনি প্রবাসে বসে মানবাধিকারবিষয়ক একটি সংস্থায় কাজ করছেন। দূর থেকে দেশের নারীদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাওয়া দেখে তাঁর বুক ফেটে যায়। তিনি জানান, আফগানিস্তানে এখন শুধু শাসকদের ইচ্ছানুযায়ী সংবাদ প্রকাশিত হয়।
কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করা মরিয়ম রেডিওতে কাজ করতে ভালোবাসতেন। পরিবারের বাধা সত্ত্বেও তিনি সাহস নিয়ে কাজ করে গেছেন। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরে কর্তৃপক্ষের চাপে তিনি চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কর্মহীন মরিয়ম এরপর পরিবার আর সমাজের চাপে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে করতে বাধ্য হন। আজ তিনি ঘরের চারদেয়ালে বন্দী, স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়ার সুযোগও তাঁর নেই। চোখের পানি মুছে মরিয়ম বলেন, ‘আমি মানুষের কণ্ঠস্বর হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ এমন অবস্থায় রয়েছি যে নিজের নামটাও বলতে পারছি না।’
সারা বিশ্বে যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে, তখন আফগানিস্তানের নারী সাংবাদিকেরা যাপন করছেন মানবেতর জীবন। সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার তো দূরের কথা, মানুষ হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতেও তাঁদের সংকুচিত হতে হচ্ছে। তবে কি আফগানিস্তানে মুক্ত গণমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়গুলো শুধুই কথার কথা হয়ে থাকবে?
সূত্র: রুখসানা মিডিয়া