আন্তর্জাতিক নারী
তেহরানের খাতাম আল-আনবিয়া হাসপাতাল। চারদিকে হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ। ধসে পড়ছে ছাদ আর দেয়াল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে ভারী ধুলা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী। জীবনের চরম সংকটে যখন মানুষ নিজের প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে, ঠিক তখনই এক নারী হয়ে উঠলেন তিন নবজাতকের রক্ষাকর্তা! তিনি ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া হাসপাতালের নার্স নেদা সালিমি। এই মানবিক কাজের জন্য ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সালিমিকে তাঁর ‘ডিয়ার ডটার’ বা প্রিয় কন্যা হিসেবে অভিহিত এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। নেদা সালিমি ও তাঁর এই অকুতোভয় কাজ এখন বিশ্বজুড়ে সেবা ও সাহসিকতার এক অনন্য প্রতীক।
সময়টা ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তৃতীয় দিন। তেহরানের খাতাম আল-আনবিয়া হাসপাতালের নিওনেটাল ওয়ার্ডে তখন দায়িত্বরত ছিলেন নেদা সালিমি। সেখানে এমন তিনটি শিশু ছিল, যাদের ভূমিষ্ঠ হওয়ার এক ঘণ্টাও পূর্ণ হয়নি তখন। শিশুদের মায়েরা নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। ঠিক সেই মুহূর্তে শুরু হয় ভয়াবহ বোমা হামলা। হাসপাতালের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই রোমহর্ষক দৃশ্য। চারপাশ কাঁপিয়ে তখন দেয়াল ধসে পড়ছে। নেদা সালিমি একমুহূর্ত দেরি না করে জীবনের মায়া ত্যাগ করে ইনকিউবেটর থেকে শিশু তিনটিকে বের করে আনেন। ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপে ভরা করিডর দিয়ে তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি নিরাপদ স্থানে চলে যান। শিশুদের কোলে নিয়ে করিডর ছাড়ার সময় তিনি মায়েদের নাম ধরে ডাকতে থাকেন। ধ্বংসস্তূপ আর কান্নার মাঝেও নেদার কণ্ঠ যেন ঐশ্বরিক শক্তিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে সুস্থ অবস্থায় শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়া হয় মায়েদের কোলে।
নেদা সালিমির অকুতোভয় সাহসিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসের কালজয়ী নার্সদের কথা। যাঁদের অবদান আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক নারী রয়েছেন, যাঁদের নিঃস্বার্থ সেবা ও উদ্ভাবনী চিন্তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যেমন আধুনিক নার্সিংয়ের পথিকৃৎ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ভয়াবহতায় লন্ঠন হাতে তিনি আহত সেনাদের সেবা দিয়ে নার্সিংকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও সম্মানজনক পেশায় রূপ দিয়েছিলেন। তাঁরই সমসাময়িক জ্যামাইকান নার্স মেরি সিকোল বর্ণবৈষম্যকে তুচ্ছ করে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়েছিলেন সেবার হাত প্রসারিত করে। নিজের ভেষজ ওষুধ ও সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন অসংখ্য প্রাণ। আবার আমেরিকান গৃহযুদ্ধের ময়দানে ক্লারা বার্টন ঝুঁকি নিয়ে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দিয়ে পরিচিত হয়েছিলেন ‘রণক্ষেত্রের ফেরেশতা’ হিসেবে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর হাত ধরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে রেডক্রস। একইভাবে ডরোথিয়া ডিক্স মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আনতে এবং রোগীদের জন্য উন্নত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই নার্সরা শুধু সেবাই দেননি, বরং সামাজিক কুসংস্কার এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের বিশেষত্ব প্রমাণ করেছেন এবং মানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন।