বিশ্বসংগীতের মঞ্চে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা শুধু বিনোদন নয়—একটি সময়, একটি শহর, এমনকি একটি সমাজের আবেগকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। গত শনিবার (২ মে) রাতে পপ গায়িকা শাকিরা ঠিক তেমনই এক ইতিহাস গড়লেন ব্রাজিলের বিখ্যাত কোপাকাবানা সৈকতে।
ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও-তে আয়োজিত ওই ফ্রি কনসার্টে শহর কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন! একটি উন্মুক্ত সমুদ্রতীর যেন রূপ নিয়েছিল সংগীতের সমুদ্রে। রাত ১১টার দিকে শুরু হওয়া এই শো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক ঘণ্টা দেরিতে হলেও দর্শকদের উচ্ছ্বাসে একটুও ভাটা ছিল না। আকাশে উড়ন্ত ড্রোনে ভেসে উঠেছিল—‘আমি তোমাকে ভালোবাসি ব্রাজিল’ লেখাটি। আর নিচে লাখো মানুষের ঢেউ।
এই কনসার্ট ছিল শাকিরার ‘লাস মুহেরেস ইয়া নো লিয়োরান’ বা ‘নারীরা আর কাঁদে না’ শিরোনামে একটি ওয়ার্ল্ড ট্যুরের অংশ। একই নামে ২০২৪ সালে তাঁর একটি অ্যালবাম রিলিজ পেয়েছিল।
স্প্যানিশ ম্যাগাজিন ‘হোলা’ জানিয়েছে, মঞ্চে উঠে শাকিরা স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন ১৮ বছর বয়সে এখানে প্রথম এসেছিলাম, স্বপ্ন দেখতাম তোমাদের সামনে গান গাওয়ার। আর আজ দেখো—জীবন সত্যিই জাদুময়।’
তাঁর কণ্ঠে একে একে ভেসে ওঠে জনপ্রিয় গান—হিপস ডোন্ট লাই, লা টর্চারা এবং লা বাইসাইক্লিটা। সবশেষে ছিল তাঁর ‘বিজেডআরপি মিউজিক সেশনস ৫৩ / ৬৬ ’। এটি মূলত তাঁর ব্যক্তিগত ভাঙনের পর তৈরি হওয়া এক শক্তির গান, যা তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক।
তবে এই রাতের সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত ছিল তাঁর একটি বাক্য। ২০ লাখ ভক্তের সামনে তিনি উচ্চারণ করেন—‘আমরা নারীরা যখন পড়ে যাই, আরেকটু জ্ঞানী হয়ে আমরা উঠে দাঁড়াই।’
শাকিরার সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক বহু দিনের। ৯০-এর দশক থেকেই তাঁর গান এখানে জনপ্রিয়তা পায়, আর সেই সেতুবন্ধন সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে। শহরের মেয়র এডুয়ার্ডো ক্যাভালিয়ারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাকিরার কনসার্টকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে লেখেন, ‘নেকড়ে নারী রিওতে ইতিহাস গড়েছে’। তিনি এই আয়োজনকে শুধু বিনোদন নয়, অর্থনীতিরও শক্তিশালী চালিকা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের জন্য উৎসব একটি গুরুত্বপূর্ণতর বিষয়—কারণ এটি কাজ সৃষ্টি করে, আয় বাড়ায়, শহরের পরিচয় গড়ে।’
গবেষণা বলছে, এই এক রাতের কনসার্ট থেকেই শহরের অর্থনীতিতে যোগ হতে পারে প্রায় ৭৭৭ মিলিয়ন রিয়াল। হোটেল, রেস্তোরাঁ, খুচরা ব্যবসা—সবখানেই এর প্রভাব পড়বে।
শাকিরার এই কনসার্ট যেন একসঙ্গে শিল্প, অর্থনীতি, স্মৃতি ও নারীর অদম্য শক্তির এক উজ্জ্বল উদ্যাপন।