টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে লৌহজং নদের তীর থেকে গত ২০ এপ্রিল এক মা ও নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় মাটিতে পুঁতে রাখা অবস্থায় মৃতদেহ দুটি উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নৃশংসতা শুধু মির্জাপুরেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশজুড়ে নারী ও কন্যাদের ওপর এই ধরনের হত্যা এবং রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুসারে, শুধু গত এপ্রিলে ৫৭ নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন ১৯ জন নারী।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এক বছরে মোট ৬৩২ জন নারী ও কন্যা হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ২১ জনকে এবং রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে আরও ২৩০ জনের। এ বছরের শুরু থেকে এই ধারা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জানুয়ারিতে ৫৫ জন নারী ও কন্যাকে হত্যা করা হয় এবং ২০ জনের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল ৩ জনকে। ফেব্রুয়ারি মাসে হত্যার শিকার হন ৩২ জন, হত্যার চেষ্টা করা হয় ২ জনকে এবং একই মাসে রহস্যজনক মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭ জন। মার্চ মাসে এই সংখ্যা ছিল ৪৭ জন হত্যা এবং ১৭ জনের রহস্যজনক মৃত্যু। এপ্রিল মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক মাসেই ৫৭ জন নারী ও কন্যা হত্যার শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪১ জনের বয়স ১৮ বছরের ওপরে। একই সময়ে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের এবং ২ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এ বছরের প্রথম চার মাসে হত্যার শিকার হয়েছেন ২৬৪ জন নারী। তাঁদের মধ্যে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ৭৩ জনের। এ ধরনের ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এরপর যখন বিচার হয় না, তা রাষ্ট্রের নারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
হত্যার এই বীভৎসতার পাশাপাশি অন্যান্য সহিংসতা ও নির্যাতনের চিত্রটিও সমানভাবে আতঙ্কের। এ বছরের জানুয়ারি মাসে ১৮৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৮৩ জন, মার্চে ১৯০ জন এবং এপ্রিলে ২২০ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৮৬টি এবং সাইবার সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১৯টি। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে নির্যাতনের এই ধারা অব্যাহত ছিল। এ সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী ও কন্যা ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের কারণে নির্যাতন, অপহরণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার ভঙ্গুর অবস্থাকেই নির্দেশ করে।