শেক্সপিয়ারের সাহিত্যে বেশ পণ্ডিত ছিলেন ইয়েং থিরিথ। ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি। কিন্তু আফসোস হলো, শেক্সপিয়ার গবেষক হিসেবে মানুষ তাঁকে মনে রাখেনি। মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে গণহত্যার দোসর হিসেবে।
সত্তরের দশকে ডেমোক্রেটিক কাম্পুচিয়া বা বর্তমানের কম্বোডিয়ায় চলছিল খেমাররুজ পার্টির নেতা কুখ্যাত পল পটের শাসন। তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ইয়েং সারি। সারির স্ত্রী ছিলেন ইয়েং থিরিথ। এ ছাড়া থিরিথের বড় পরিচয় ছিল, তিনি ছিলেন পল পটের শ্যালিকা অর্থাৎ প্রথম স্ত্রী খিউ পোনারির বোন। থিরিথকে বলা হতো ‘ফার্স্ট লেডি’। খেমাররুজ পার্টির স্থায়ী কমিটির সদস্য বা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য না থেকেও থিরিথ ছিলেন পার্টির প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী। পল পটের শাসনামলে কাম্পুচিয়ায় সংঘটিত হয় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। ফলে দেশটির প্রায় ২০ লাখ মানুষ অনাহারে, চিকিৎসার অভাবে, অতিরিক্ত পরিশ্রমে এবং সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে মারা যায়।
এই গণহত্যার পলিসিমেকারদের মধ্যে অন্যতম থিরিথ। ফলে একজন শেক্সপিয়ার গবেষক হিসেবে নয়, এই গণহত্যার সহযোগী হিসেবে তাঁকে মনে রেখেছে বিশ্ব।
১৯৩২ সালের ১০ মার্চ কম্বোডিয়ার নমপেনে এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম হয় ইয়েং থিরিথের। তাঁর বাবা ছিলেন কম্বোডিয়ার এক নামকরা বিচারক। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর বাবা পরিবার ত্যাগ করে কম্বোড়িয়ার এক রাজকুমারীর সঙ্গে বাত্তামবাংয়ে পালিয়ে যান। থিরিথ নমপেনের লাইসি সিসোয়াথ থেকে স্নাতক শেষ করেন। পরে তিনি তাঁর বড় বোনের সঙ্গে প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেন এবং শেক্সপিয়ারের সাহিত্য বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। থিরিথ ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে ডিগ্রি অর্জন করা কম্বোডিয়ার প্রথম নাগরিক।
লেখাপড়া শেষে প্যারিসের গ্ল্যামারাস জীবন ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন কম্বোডিয়ায়। ১৯৫৭ সালে দেশে ফিরে তিনি একটি ইংরেজি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করলেও দ্রুত স্বামীর সঙ্গে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এরপর খেমাররুজ পার্টি ক্ষমতা দখল করলে দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী হয়ে ওঠেন ইয়েং থিরিথ।
থিরিথকে শুধু একজন প্রভাবশালী নেতার স্ত্রী হিসেবে দেখা ভুল হবে। তিনি ছিলেন দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সক্রিয় সদস্য। ছিলেন খেমাররুজ আন্দোলনের ‘ফার্স্ট লেডি’ এবং সামাজিক-বিষয়ক মন্ত্রী। তিনি সেই শাসনব্যবস্থার অন্যতম শীর্ষ মস্তিষ্ক ছিলেন। সেই নৃশংস শাসনব্যবস্থার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের খুব সামান্য কয়েকজন মানুষের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। খেমাররুজরা শিক্ষিত সমাজকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। আর সেই দলের অন্যতম নেত্রী থিরিথ নিজে ছিলেন উচ্চশিক্ষিত।
মন্ত্রী থাকাকালীন থিরিথের নির্দেশে বহু মানুষকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। সাধারণ মানুষকে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়ে তিনি রি-এডুকেশন ক্যাম্পে পাঠাতেন। যাঁদের অধিকাংশকে পরে হত্যা করা হতো।
খেমাররুজদের কুখ্যাত গণবিয়ে কিংবা জোর করে বিয়ের প্রথা নিয়ন্ত্রণেও থিরিথের সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি এসব অস্বীকার করতেন। খেমাররুজ শাসনের পতনের পর তিনি দীর্ঘকাল লুকিয়ে ছিলেন। এরপর ২০০৭ সালে স্বামীসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ২০১১ সালে যখন তাঁর বিচার শুরু হয়, চিকিৎসকেরা তখন জানান, তিনি আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত। সে সময় থিরিথ আদালতকক্ষেও অদ্ভুত আচরণ করতেন এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করতেন। মানসিক অসুস্থতার কারণে ২০১২ সালে আদালত তাঁকে বিচারের অনুপযুক্ত ঘোষণা করে মুক্তি দেন। ২০১৩ সালে তাঁর স্বামী ইয়েং সারি মারা যান। এর দুই বছর পর ২০১৫ সালে মারা যান ইয়েং থিরিথ।
সূত্র: এএফপি, টাইমস ম্যাগাজিন