সিরীয় নারীর জয়যাত্রা
সিরিয়ার জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি গত কয়েক দশকের নতুন ঘটনা নয়। এটি প্রাচীনকাল থেকে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ঐতিহাসিক পরিক্রমা। পালমিরা ও উগারিতের মতো প্রাচীন নগর সভ্যতায় শাসন ও প্রশাসনে নারীদের সম্পৃক্ততার নজির পাওয়া যায়। মূলত তখন থেকে এই যাত্রার শুরু। তবে উনিশ শতকের শেষভাগে এসে নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে নারী সংগঠনের কাজে কিছু গুণগত পরিবর্তন আসে। সিরিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নের এই দীর্ঘ যাত্রা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কিছু সময় তাঁদের অগ্রগতি দৃঢ় হয়েছে, আবার কিছু সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তাঁদের পিছিয়ে দিয়েছে। এই ইতিহাস বোঝা জরুরি। কারণ, এটি সিরীয় নারীদের সংগ্রাম ও সমাজ গঠনে তাঁদের ভূমিকা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
প্রাচীন ঐতিহ্য ও সামাজিক উপস্থিতি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রাচীন সিরীয় সভ্যতাগুলোতে নারীরা অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনে সক্রিয় ছিলেন। উগারিত ও মারির মতো প্রাচীন নগর সভ্যতার নথিপত্রে সম্পত্তি এবং মন্দির ব্যবস্থাপনায় নারীদের ভূমিকার প্রমাণ ছিল। রোমান ও বাইজেন্টাইন যুগেও প্রচলিত সামাজিক কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকলেও নারীদের সামাজিক এবং ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণ ছিল। ইসলামি এবং অটোমান আমলে নারীরা ধর্মীয় ওয়াক্ফ, শিক্ষা ও দাতব্যকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষত দামেস্ক ও আলেপ্পোর মতো বড় শহরগুলোতে তাঁরা স্কুল, হাসপাতাল এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
উনিশ শতকের শেষ ভাগ
জাগরণের শুরু ১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অটোমান সংস্কার বা ‘তানজিমাত’-এর প্রভাবে শহরগুলোতে নারীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সচেতনতা তৈরি হতে থাকে। ১৮৭০-এর দশকে প্রথম নারী সাহিত্য সভা প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা সংস্কার, শিক্ষা এবং নারীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতেন। ১৮৯৩ সালে শিকাগো বিশ্ব মেলায় সিরীয় নারীদের অংশগ্রহণ তাঁদের ব্যক্তিগত গণ্ডি থেকে বৃহত্তর জনপরিসরে আসার ইঙ্গিত দেয়। ১৯১০ সালে ‘আল-আরুস’ নামে প্রথম নারীবিষয়ক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়, যা নারী অধিকারের পক্ষে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।
বিশ শতকের শুরু: সংগঠন ও জাতীয় আন্দোলন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সময় দুর্ভিক্ষ ও মহামারির কবলে পড়া মানুষের সেবায় নারীরা সুসংগঠিতভাবে ত্রাণকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে ফরাসি ম্যান্ডেট বা ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামেও নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯২০ সালে মায়সালুনের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করা থেকে শুরু করে গ্রেট সিরিয়ান বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের আশ্রয় দেওয়া, বার্তা আদান-প্রদান, আহতদের সেবা এবং অর্থ সংগ্রহ করার মাধ্যমে সিরিয়ান নারীরা মুক্তি আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। ওই সময় দামেস্ক ও আলেপ্পোতে বিভিন্ন নারী সংগঠন গড়ে ওঠে। এসব সংগঠন শিক্ষা, সাক্ষরতা ও দরিদ্রদের সহায়তায় কাজ করে। তবে ১৯২০ থেকে ৩০-এর দশকে নারীরা শুধু দাতব্যকাজ নয়, আইনি ও সামাজিক সংস্কারের দাবিও তুলতে শুরু করেন। যেমন বিয়ের ন্যূনতম বয়স বৃদ্ধি ও শিক্ষা বিস্তার।
এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নারীনেত্রীদের মধ্যে ছিলেন নাজিক আল-আবিদ (১৮৮৭-১৯৫৯)। তিনি ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে অংশ নেন এবং মেয়েদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের জন্য ‘নুর আল-ফায়হা’ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি সিরিয়ার প্রথম নারী সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম। ‘নুর আল-ফায়হা’ নারী শিক্ষা, ভোটাধিকার এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে নারীর মুক্তির পক্ষে কাজ করত।
এ সময়ের নারীনেত্রীদের মধ্যে ছিলেন কুর্দি
নারী লেখক ও শিক্ষাবিদ রোশেন বেদির খান (১৯০৯-১৯৯২)। তিনি লাতিন বর্ণমালায় লেখালেখি শুরু করেন এবং ১৯৪৫ সালে কায়রোতে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে যোগ দেন।
সিরীয় নারীদের রাজনৈতিক অধিকার (১৯৪৯-১৯৫৩)
১৯৪৬ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতার পর সিরীয় নারীরা পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকারের দাবি তোলেন। ১৯৪৯ সালে তাঁরা ভোটাধিকার লাভ করেন এবং ১৯৫৩ সালের সংবিধানে তাঁদের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার দেওয়া হয়। ওই অঞ্চলের অনেক দেশের তুলনায় এটি ছিল অগ্রগামী পদক্ষেপ।
১৯৬৭ থেকে ২০১১: দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন সংগ্রাম ১৯৬৩ সালে বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসার পর ১৯৬৭ সালে ‘জেনারেল উইমেনস ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারী আন্দোলনকে রাষ্ট্রের একটি কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও ব্যক্তিগত ও নাগরিক আইনের মৌলিক সংস্কারগুলো অধরাই থেকে যায়। ২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে সিরিয়ায় যখন বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন নারীরা গণমাধ্যম ও ত্রাণকাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
এ সময় অনেকে গ্রেপ্তার ও নিখোঁজ হন। তবে যুদ্ধের ভয়াবহতায় লাখ লাখ সিরীয় বাস্তুচ্যুত হলেও দেশ ও বিদেশের আশ্রয়শিবিরে অসংখ্য নারী সংগঠন গড়ে ওঠে, যেগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘন
ও লৈঙ্গিক ভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। কিন্তু নারীদের দাপ্তরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হলেও সিরিয়ার উত্তর ও পূর্ব অঞ্চলে (রোজাভা) নারী অধিকারের এক ভিন্ন মডেল তৈরি হয়।
আশির দশকে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ ওকালানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই অঞ্চলে নারী আন্দোলন জোরদার হয় এবং নারীদের বিভিন্ন সংগঠন গড়ে ওঠে। ২০১২ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে শুরু হওয়া ‘রোজাভা বিপ্লব’কে অনেকে ‘নারী বিপ্লব’ হিসেবেও অভিহিত করেন। এখানে রাজনীতি, কূটনীতি ও সামরিক বাহিনী—সব ক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ ছিল। ওই সময় রোজাভার নারীদের নিয়ে গঠিত কুর্দি সামরিক বাহিনী ‘উইমেনস প্রোটেকশন ইউনিটস’ আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে।
সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ২৪ বছরের শাসনের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে ৬১ বছর ধরে চলা বাথ পার্টির একনায়কতন্ত্রের অবসান হয়। এরপর হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) প্রধান আহমেদ আল-শারা ওরফে আবু মুহাম্মদ আল-জোলানি ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
এখন সিরীয় নারীরা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া নতুন সরকারের নতুন নীতির কারণে নারীর শিক্ষা ও স্বাধীনতায় বিধিনিষেধ আরোপ করাসহ আগের অনেক আইন বাতিল করা হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন বর্তমানে সিরিয়াজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে,
নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নারীদের স্থান কী হবে, তা নিয়ে। নারীরা আদৌ তাঁদের প্রাপ্য স্থান ফিরে পাবেন কি?
হাওয়ার নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত লেখা থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা।