হোম > নারী

বাঁশ-বেতে বোনা পাহাড়ি ঐতিহ্যের গল্প

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান 

লাকি চাকমা

রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ের এক অকুতোভয় নারী লাকি চাকমা। সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি আগলে রেখেছেন পাহাড়ের হারানো ঐতিহ্য। পাহাড়ের বুক চিরে যখন ভোরের সূর্য ওঠে, তখন রাঙামাটি, বান্দরবান বা খাগড়াছড়ির সবুজ অরণ্য শুধু জেগেই ওঠে না, জেগে ওঠে এক প্রাচীন সংস্কৃতি। এই জনপদ শুধু ঝরনা আর মেঘের লুকোচুরির জন্য অনন্য নয়; বরং এখানকার প্রতিটি পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার গভীরে মিশে রয়েছে তাদের নিজ নিজ ইতিহাস। সেই ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে তাদের বাসনপত্র। এগুলো শুধু রান্নাবান্না বা ঘরকন্নার সাধারণ সামগ্রী নয়; বরং পাহাড়ের মানুষের আত্মপরিচয় আর শৈল্পিক চেতনার এক জীবন্ত দলিল।

লাকি চাকমা সেই যোদ্ধা, যিনি স্টিল আর প্লাস্টিকের চাকচিক্যের ভিড়ে পাহাড়ের অকৃত্রিম সম্পদকে নতুন করে প্রাণ দিচ্ছেন। তাঁর হাতে বোনা প্রতিটি বাঁশের খাঁজ আর বেতের বুননে যেন লুকিয়ে থাকে একেকটি গল্পের পাহাড়।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে লাকি চাকমা যখন নিজের স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন, তখন পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ ছিল তাঁর সামনে। যে ঐতিহ্য এখন শুধু বিয়েবাড়ি আর বৈসু, সাংগ্রাই বা বিজুর মতো উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, তাকে দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে আনা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। লাকির হাত ধরে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে চাকমা সম্প্রদায়ের সরল নকশার বাসনপত্র, মারমাদের শৈল্পিক কারুকাজ আর ম্রোদের প্রকৃতিঘেঁষা বুননশৈলী। রান্নার পাত্র থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহের ঝুড়ি, মাছ ধরার অনন্য সব ফাঁদ কিংবা ঘর সাজানোর বিভিন্ন আসবাব—সবখানেই রয়েছে বাঁশের জাদুকরি ছোঁয়া। চাকমাদের হাল্লোং, ফুর বারেং, দুলো, হুরুম, লুই, সাম্মো, পেরাবা আর মেজাংয়ের মতো নামগুলো শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুর্গম পাহাড়ের সহজ-সরল জীবনধারা। এসব জিনিসের বড় গুণ হলো, এগুলো ওজনে হালকা; কিন্তু স্থায়িত্বে কয়েক দশকের গ্যারান্টি।

লাকির এই উদ্যোগ আজ শুধু তাঁর একার লড়াই নয়, এটি পাহাড়ের শত শত নারীর কর্মসংস্থানের ঠিকানাও হতে পারে। পাহাড়ের নারীরা সহজাতভাবে বাঁশ ও বেতের কাজে পারদর্শী। প্রচুর ধৈর্য আর মমতা দিয়ে একেকটি ঝুড়ি বা ডালা তৈরি করতে তাঁরা দিনের পর দিন সময় ব্যয় করেন। কিন্তু এ শিল্পের পথ এখন কণ্টকাকীর্ণ। দক্ষ কারিগরের অভাব পাহাড়জুড়ে। যাঁরা একসময় নিপুণ হাতে কাজ করতেন, তাঁরা বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন। এদিকে নতুন প্রজন্ম রুটিরুজির টানে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এই প্রাচীন বিদ্যা থেকে।

লাকি চাকমার সঙ্গে পাঁচজন কারিগর কাজ করছেন এখন। কিন্তু তাঁদের দিয়ে বিশাল চাহিদার জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারিগরদের মধ্যে তিনজন নিয়মিত কাজ করেন, বাকি দুজন অনিয়মিত। এ ছাড়া রয়েছে বিশেষ কিছু জাতের বাঁশ, যা দিয়ে এসব সামগ্রী তৈরি হয়—বন উজাড় হওয়ার ফলে সেগুলোও আজ বিলুপ্তপ্রায়।

সাবাংগী নারী উদ্যোক্তা সমিতির সভানেত্রী ত্রিশিলা চাকমা ও উন্নয়নকর্মী নুকু চাকমাদের মতে, এই শিল্পকে শুধু আবেগ দিয়ে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন বড় পুঁজি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং কারিগরদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ। বাঁশকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের ডিজাইনে বৈচিত্র্য আনতে পারলে এ শিল্প বিশ্ববাজারেও জায়গা করে নিতে পারবে বলে মনে করেন তাঁরা। পর্যটনশিল্পের বিকাশ পাহাড়ি জিনিসপত্র বিক্রির নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। পাহাড় ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা এখন প্লাস্টিকের বদলে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে এসব টেকসই আর শৈল্পিক পণ্য বেশি পছন্দ করছেন। তবে যথাযথ বিপণনব্যবস্থার অভাবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

পাহাড়ে লাকি চাকমার এ লড়াইকে অসম বলার অনেক কারণ রয়েছে। সেই কারণগুলো অতিক্রমের চেষ্টাও তিনি করে চলেছেন। তাঁর চেষ্টা সফল না হলে পাহাড়ের এই বাঁশ-বেতের শিল্প হয়তো হারিয়ে যাবে একদিন।

নারী জোগায় জ্বালানি, শাসনে পুরুষ: বিপ্লবে লৈঙ্গিক বৈষম্যের লড়াই

নিজের শিল্পকর্মের কপিরাইট স্বত্ব বুঝে নিন

বাংলা সাহিত্যের গীতিকবি মাহমুদা

সব যুদ্ধের প্রথম শিকার নারী

জলের গভীরে জান্নাতির জয়যাত্রা

ব্যক্তিত্বের সমস্যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়ে থাকে

পেঙ্গুইনের জন্য নিবেদিত পি ডি বোরসমা

কেউ তাঁকে চাঁদ এনে দেয়নি, নিজেই চাঁদ ধরতে গিয়েছিলেন

চন্দ্রিমার ব্যবসায় ভরা মৌসুম

মারিয়ার হাত ধরে লন্ডনের আঙিনায় সিয়েরা লিওনের স্বাদের জাদু