একসময় সাম্রাজ্যের লোকজন গর্ব করে বলত, তাদের সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না। কিন্তু মধ্যপ্রদেশের ছোট শহর শেহোরের এক ভুলে যাওয়া কাগজ যেন অন্য গল্প বলে। সেখানে ইঙ্গিত আছে, সেই শক্তিশালী সাম্রাজ্যকেও একসময় ভোরের আলো দেখতে এক স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল।
প্রায় ১০৯ বছর আগে ১৯১৭ সালে যখন বিশ্বযুদ্ধের তাপে পৃথিবী জ্বলছিল এবং সাম্রাজ্যিক প্রশাসন টালমাটাল। তখন ব্রিটিশ সরকার নাকি ৩৫ হাজার রুপি ধার নিয়েছিল শেহোর ও ভোপাল প্রিন্সলি স্টেটের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী শেঠ জুম্মালাল রুথিয়ার কাছ থেকে। সে সময়ের হিসাবে এই অঙ্ক ছিল বিশাল। এমন অর্থ দিয়ে ভাগ্য বদলানো যেত, জমিদারি গড়া যেত, রাজদরবার ও ঔপনিবেশিক প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করা যেত।
এই ঘটনার বিস্ময় শুধু ঋণ নেওয়ায় নয়, বরং এরপর যা ঘটেনি, তাতেই। রুথিয়া পরিবারের দাবি, সেই টাকা আর কখনো শোধ করা হয়নি। এক শতাব্দীর বেশি সময় পর জুম্মালালের নাতি বিবেক রুথিয়া জানান, তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে আইনি নোটিশ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, এটি একটি ‘ঐতিহাসিক এবং এখনো পরিশোধ না করা সার্বভৌম ঋণ।’
বিবেক রুথিয়ার দাবি, তাঁর বাবার মৃত্যুর পর পুরোনো নথি আর পারিবারিক উইলের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে দলিল, সনদ ও চিঠিপত্র। তিনি বলেন, ‘১৯১৭ সালে আমার দাদা প্রয়াত শেঠ জুম্মালাল রুথিয়া ব্রিটিশ সরকারকে ৩৫ হাজার রুপি ঋণ দিয়েছিলেন। আজ পর্যন্ত সেই অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।’ তাঁর মতে, নথিতে উল্লেখ আছে যে ব্রিটিশ শাসনামলে ভোপাল রাজ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সুসংগঠিত করতে এই ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এটিকে ‘ওয়ার লোন’ বা যুদ্ধঋণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সেঠ জুম্মালাল রুথিয়া ১৯৩৭ সালে মারা যান। ঋণ দেওয়ার প্রায় ২০ বছর পর তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি, বিষয়টি তখনো মীমাংসিত হয়নি। ধীরে ধীরে তা বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। ১৯১৭ সালের ৩৫ হাজার রুপি আজকের হিসাবে ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু বিবেক রুথিয়ার দাবি, বর্তমান মূল্যে তা কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, ‘যদি ১৯১৭ সালের স্বর্ণের দামের ভিত্তিতে হিসাব করে আজকের দামের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে অঙ্কটা অনেক বড় হয়ে যাবে।’ অর্থাৎ যে টাকা একসময় যুদ্ধকালীন প্রশাসন চালাতে কাজে লেগেছিল, আজ তা বিপুল সম্পদে রূপ নিতে পারে।
পরিবারটি আন্তর্জাতিক আইনের নীতির কথা তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের যুক্তি, সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো তাত্ত্বিকভাবে আগের নেওয়া ঋণ পরিশোধে বাধ্য। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন মামলা বিরল এবং জটিল। তবে উপনিবেশ আমলে ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিগত নাগরিকের মধ্যে হওয়া লেনদেনের ক্ষেত্রে, যদি প্রামাণ্য নথি থাকে, তাহলে তা অস্বাভাবিক আইনি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
স্বাধীনতার আগে রুথিয়া পরিবার শেহোর ও ভোপাল রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও ধনী পরিবার ছিল। প্রশাসনিক প্রভাব ও আর্থিক শক্তির জন্য তারা পরিচিত ছিল। তাদের বিপুল জমি ও সম্পত্তি ছিল বলে জানা যায়। এখনো বলা হয়, শেহোরের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বসতি এমন জমিতে গড়ে উঠেছে, যা একসময় রুথিয়াদের মালিকানায় ছিল।
পরিবারটির এখনো শেহোর, ইন্দোর ও ভোপালে সম্পত্তি আছে। তারা কৃষি, হোটেল–এস্টেট ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে পুরোনো অনেক জমিদার পরিবারের মতো তারাও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে আছে। বহু দশক আগে নামমাত্র ভাড়ায় নির্ধারিত ভাড়া নিয়েও বিভিন্ন মামলা চলছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি