চীনে ৬২ বছর বয়সী এক নারী গর্ভধারণের ছয় মাস পার করছেন। তিনি অনাগত সন্তানকে তাঁর মৃত একমাত্র ছেলের পুনর্জন্ম হিসেবে দেখছেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দাহে নিউজের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে হংকংয়ের ইংরেজি দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
ঘটনাটি উত্তর-পূর্ব চীনের জিলিন প্রদেশের সংইউয়ানের। মূল ভূখণ্ডের একটি শীর্ষস্থানীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারীর ছোট বোন নিয়মিত তাঁর অন্তঃসত্ত্বা বড় বোনের জীবনের হালনাগাদ তথ্য শেয়ার করছেন। এই হবু মা জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো গর্ভবতী হয়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি তাঁর একমাত্র ছেলেকে হারান। তবে ছেলের বয়স কত ছিল বা কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছু জানানো হয়নি। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ওই নারী ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) পদ্ধতির মাধ্যমে গর্ভধারণ করেন। প্রতিবেদনে তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
ডিসেম্বরের শেষে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ওই নারীকে ক্যামেরার সামনে বেশ ফুরফুরে মেজাজে বলতে শোনা যায়, ‘আমার মনে হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের আগেই বাচ্চা পৃথিবীতে চলে আসবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘সন্তান পেটে বেশ লাথি মারে। আমি দেখেছি যখনই মিষ্টিজাতীয় খাবার খাই, সে আরও বেশি নড়াচড়া শুরু করে।’
চীনে ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ বা হবু মায়েদের তা জানানো আইনত নিষিদ্ধ। মূলত পুত্রসন্তান লাভের প্রাচীন আকাঙ্ক্ষা থেকে মেয়ে ভ্রূণকে পরিকল্পিতভাবে গর্ভপাত করানোর আশঙ্কায় এই কঠোর নিয়ম জারি করা হয়েছে। তবে ওই নারী ভিডিও ক্লিপে বলেন, ‘অনেকেই আমাকে বলছেন যেহেতু ইদানীং আমি প্রচুর মিষ্টি খাচ্ছি, তাই হয়তো ছেলেই হবে। তার মানে আমার ছেলেই ফিরে আসছে।’
বয়স বিবেচনায় কম বয়সী অন্তঃসত্ত্বা নারীদের তুলনায় তাঁকে অনেক বেশিবার শারীরিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রতিবারই তাঁর সঙ্গে থাকেন ছোট বোন, যিনি অনলাইনে ‘শাও ওয়েই’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে ভিডিওগুলো শেয়ার করেন। বিশেষ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাঁদের নিজ শহর সংইউয়ান থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে জিলিনের রাজধানী চাংচুনের বড় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে যেতে হয়।
হেইলং প্রদেশের হারবিন ১ নম্বর হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক চেন মিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা খুব বেশি বয়সে গর্ভধারণকে সমর্থন করি না। কারণ, এতে অত্যন্ত ঝুঁকি থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অল্পবয়সী গর্ভবতীদের তুলনায় তাঁদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাঁদের জন্য সিজারিয়ান সেকশন বা অস্ত্রোপচার ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না, যা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।’
চিকিৎসকের মতে, যদি কোনো নারী সত্যিই বেশি বয়সে সন্তান নিতে চান, তবে গর্ভধারণের আগে তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ শারীরিক পরীক্ষা করানো উচিত। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ কঠোরভাবে মেনে চলা এবং জরুরি অবস্থার মোকাবিলায় সক্ষম বড় কোনো হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
৬২ বছর বয়সী এই নারীর সিদ্ধান্তের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত। একজন পর্যবেক্ষক মন্তব্য করেছেন, ‘সন্তান দেখাশোনার মতো প্রয়োজনীয় শক্তি কি আপনার আছে? তা ছাড়া আপনি ও আপনার স্বামী মারা গেলে সন্তানটি অল্প বয়সেই এতিম হয়ে পড়বে। এমনকি বড় হওয়ার পরও সহপাঠীদের বাবা-মাকে জীবিত দেখলে সে মনে অনেক কষ্ট পাবে।’
তবে অনেকে আবার এই বয়স্ক দম্পতির পাশে দাঁড়িয়েছেন। একজনের মতে, ‘মানুষের বেঁচে থাকার জন্য একটা আবেগীয় আশ্রয় এবং মানসিক অবলম্বন প্রয়োজন। এগুলোই জীবনের মূল প্রেরণা।’ ছোট বোন শাও ওয়েই সব সমালোচনার জবাবে বলেছেন, ‘আমার বোনের জেদের কারণ কেউ বুঝবে না। একমাত্র সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করার ক্ষমতা কারও নেই।’