প্রযুক্তিবিশ্বে ভবিষ্যতে যা আসতে চলেছে, তা বিস্ময়কর। সেই সব প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রার ধরন, শরীরের যত্নআত্তির সংজ্ঞা বদলে দেবে এবং জলবায়ুর বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করবে।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে আপনি নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন, যখন দেখছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কবিতা লেখা হয়ে যাচ্ছে, একটি শব্দ থেকে আঁকা হচ্ছে ছবি কিংবা বায়োনিক চোখ, বিশাল হলোগ্রাম এবং ল্যাবে তৈরি হচ্ছে খাবার। এগুলোর সঙ্গে যোগ হতে চলেছে আরও অনেক কিছু।
নেক্রোবোটিকস
কখনো কখনো ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগুলো আশ্চর্যজনকভাবে এমন উন্নতির কথা বলে, যা শুনে আগামী দিনের পরিবর্তনের সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস ও ভয়ংকর এক অনুভূতি জাগে।
নেক্রোবোটিকস তেমনই একটি প্রযুক্তি। এ নাম খেয়াল করলে বুঝতে অসুবিধা হবে না, এর সঙ্গে মৃত জিনিসগুলোকে রোবটে পরিণত করার একটি সম্পর্ক আছে। যদিও এটি শিহরণ জাগানো ভৌতিক সিনেমার প্লটের মতো শোনাচ্ছে, তবু এটিই সত্যি। রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি প্রযুক্তির অন্বেষণ চলছে। গবেষক দলটি একটি মৃত মাকড়সাকে একটি রোবটসদৃশ গ্রিপারে পরিণত করেছে এবং তাতে অন্য বস্তু তোলার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রথমে মৃত মাকড়সা নিয়ে তাতে বাতাস ইনজেকশন করা হয়। এটি অদ্ভুতভাবে কাজ করে। কারণ, মাকড়সা তাদের অঙ্গে রক্তের হেমোলিম্ফ জোরদার করার জন্য হাইড্রোলিক ব্যবহার করে। এ মুহূর্তে গবেষণাটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে কে বলতে পারে, ভবিষ্যতে মৃত প্রাণীদের কাজে লাগিয়ে এই প্রযুক্তি আরও বিকশিত হবে না।
বালুর ব্যাটারি
আমাদের ভবিষ্যৎকে উন্নত করতে প্রতিটি প্রযুক্তি জটিল হতে হবে, এমন নয়। কিছু সহজ ও অত্যন্ত কার্যকর প্রযুক্তিও ভবিষ্যৎকে উন্নত করতে পারে। বালুর ব্যাটারি তেমনই একটি সহজ কিন্তু কার্যকর প্রযুক্তি হতে পারে। এক দল ফিনিশ প্রকৌশলী বালুকে একটি বিশাল ব্যাটারিতে পরিণত করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন।
ওই প্রকৌশলীরা প্রথমে ৪×৭ মিটার স্টিলের পাত্রে ১০০ টন বালু স্তূপ করে রাখেন। এরপর বিশাল বালুর স্তূপকে বায়ু ও সৌরশক্তি ব্যবহার করে উত্তপ্ত করে নেন। বালু এতটাই উত্তপ্ত হয় যে সেই তাপ চাইলেই কাছাকাছি এলাকার বিল্ডিংগুলোকে উষ্ণ করতে ব্যবহার করা যেত। দীর্ঘ সময়ের জন্য এভাবে শক্তি সংরক্ষণ করার জন্য বালুর ব্যাটারি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
ইন্টেলিজেন্ট এক্সো-স্কেলিটনস
জনপ্রিয় কল্পকাহিনি এবং বাস্তব জীবন—উভয় ক্ষেত্রেই বহু বছর ধরে এক্সো-স্কেলিটনস বিদ্যমান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিটি আরও দ্রুত চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, প্রযুক্তিটি এখন তরুণদের জন্য আরও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এটলাস ২০৩০-কে শিশুদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা সবচেয়ে উন্নত মোবাইল মেডিকেল এক্সো-স্কেলিটন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যদিও এই প্রযুক্তির এখনো বাণিজ্যিকীকরণ হয়নি। তবে এটি ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
কেননা এটি গুরুতর নিউরোমাসকুলার রোগ, সেরিব্রাল পালসি বা স্পাইনা বিফিডা রোগে আক্রান্ত শিশুদের হাঁটতে সাহায্য করবে।
শক্তি সঞ্চিত ইট
বাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত লাল ইটে শক্তি সঞ্চয় করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরিতে সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা সস্তা বিল্ডিং উপাদান ইটকে স্মার্ট ব্রিকসে পরিণত করতে পারে। সেসব স্মার্ট ইট ব্যাটারির মতো শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, এই ইট দিয়ে তৈরি দেয়ালগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। এসব ইটের নমুনায় পেডট নামে পরিচিত একটি পরিবাহী আবরণ স্থাপন করা হয়, যেটি পরে ইটগুলোর ছিদ্রযুক্ত কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে এবং তাদের শক্তি সঞ্চয়কারী ইলেকট্রোতে রূপান্তর করে। ইটের লাল রঞ্জক বা আয়রন অক্সাইড এই প্রক্রিয়া ঘটাতে সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
ডিরেক্ট এয়ার ক্যাপচার
উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ত্যাগ করে। এটি সম্ভব হয় শুধু সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার কারণে। আমরা শ্বসনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করি এবং অক্সিজেন গ্রহণ করি। শুধু শ্বসনপ্রক্রিয়া থাকলে দেখা যেত, বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতো। সালোকসংশ্লেষণের কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অক্সিজেনের ভারসাম্য বজায় আছে। নতুন এই প্রযুক্তি গাছের মতো একই ভূমিকা পালন করতে পারে। ডিএসি এমন একটি প্রযুক্তি যার মাধ্যমে বাতাস থেকে কার্বন শুষে নেওয়া যায়। একটি ডিএসি প্ল্যান্টে ফ্যানের মাধ্যমে বাতাস শোষণ করা হয়। এরপর সেই বাতাস বিভিন্ন একটি বিশেষ ফিল্টারের মধ্য দিয়ে পরিবাহিত করা হয়। বাতাসের কার্বন কণা ফিল্টারে জমা হয় এবং সতেজ বাতাস আবার বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে সেই ফিল্টারে তাপ প্রয়োগ করে কার্বন আলাদা পাত্রে জমা করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই কার্বনকে খনিজ পদার্থে রূপান্তর করে ভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
যদিও এই প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু এ মুহূর্তে এর অনেক জটিলতাও রয়েছে। এখন সরাসরি এয়ার ক্যাপচার সুবিধা চালু আছে। কিন্তু বর্তমান মডেলগুলো চালানোর জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। যদি ভবিষ্যতে শক্তির মাত্রা কমানো যায়, তাহলে পরিবেশের জন্য ডিরেক্ট এয়ার ক্যাপচার একটি সেরা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হতে পারে।
তথ্যসূত্র: ফোর্বস, বিবিসি