বিশ্বের ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট যে প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, সেই পিএইচপিতে (PHP) শনাক্ত হওয়া দুটি বড় ধরনের সফটওয়্যার ত্রুটি বা ‘বাগ’ সামাল দিতে গত কয়েক দিনে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে প্রযুক্তি বিশ্ব। কোনো বাণিজ্যিক প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই চেক প্রজাতন্ত্রের ওন্দ্রেজ সুরির একক প্রচেষ্টায় এই সংকট থেকে রক্ষা পেয়েছে ইন্টারনেট ব্যবস্থা।
উন্মুক্ত সোর্স বা ‘ওপেন সোর্স’ কোডভিত্তিক প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ‘রিমোট কোড এক্সিকিউশন’ (RCE) ত্রুটি সম্প্রতি উন্মোচিত হয়। এই ত্রুটি ব্যবহার করে সাইবার অপরাধীরা দূর থেকেই সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তথ্য চুরি করতে পারে কিংবা সাইট পুরোপুরি অকার্যকর করে দিতে পারে। নিরাপত্তা গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সহায়তায় এই ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করেছিলেন।
তবে পিএইচপি নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘পিএইচপি ফাউন্ডেশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ত্রুটি সংশোধনের (প্যাচ) কোড প্রকাশের আগেই ইন্টারনেটের একটি ফোরামে তা ফাঁস হয়ে যায়। এর পরই শুরু হয় সাইবার অপরাধী এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দৌড়ঝাঁপ।
সাইবার অবকাঠামো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ প্রিন্স জানান, তথ্য ফাঁসের মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার সাইবার হামলার চেষ্টা চালানো হয়, যা পরবর্তীতে দ্রুত কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায়। জরুরি ভিত্তিতে আপডেট ইনস্টল করার জন্য জার্মানি ও ফিনল্যান্ডের সরকারি ওয়েবসাইট, ইউরোপের বেশ কিছু হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিশ্বের অসংখ্য সাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
আজকের আধুনিক ইন্টারনেটে PHP (Hypertext Preprocessor)-এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের যত ওয়েবসাইটের ব্যাকএন্ড বা সার্ভার-সাইড ল্যাঙ্গুয়েজ রয়েছে, তার প্রায় ৭০ শতাংশই পিএইচপি দিয়ে পরিচালিত। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিএমএস)—ওয়ার্ডপ্রেস (WordPress), যা ইন্টারনেটের ৪০ শতাংশের বেশি ওয়েবসাইট চালায়, তা পুরোপুরি পিএইচপির ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া জুমলা ও ড্রুপালও পিএইচপি চালিত।
১৯৯৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রোগ্রামিং ভাষাটি প্রায় সমস্ত ওয়েব হোস্টিং প্রোভাইডারের সিস্টেমে ডিফল্টভাবে সাপোর্ট করে। ফলে এর সেটআপ ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত সহজ।
নতুন পিএইচপি ৮+ সংস্করণে JIT Compiler যুক্ত হওয়ায় এর গতি বহুগুণ বেড়েছে। পাশাপাশি Laravel এবং Symfony-এর মতো আধুনিক ফ্রেমওয়ার্ক বৃহৎ এন্টারপ্রাইজ তৈরিতে এই ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ ছাড়া ওপেন-সোর্স হওয়ায় এর কোনো লাইসেন্স খরচ নেই এবং ৩০ বছরের পুরোনো ভাষা হওয়ায় বিশ্বের সব জায়গায় এর বিপুলসংখ্যক ডেভেলপার রয়েছে।
এক কথায় বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ই-কমার্স, সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইটের মূল ভিত্তি পিএইচপি। এটি ভেঙে পড়লে পুরো বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে।
ডিজিটাল দুনিয়ার সিংহভাগ ওয়েবসাইট যখন এই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছিল, ঠিক তখনই উদ্ধারকর্তা হিসেবে সামনে আসে ওন্দ্রেজ সুরির নাম। তিনি পেশায় ‘ইন্টারনেট সিস্টেমস কনসোর্টিয়াম’-এর ডোমেইন নেম সিস্টেম (DNS) ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক। তবে পিএইচপির উন্নয়ন ও হালনাগাদ প্যাকেজ বিতরণের কাজ তিনি গত ২০ বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে করে আসছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রেডিটে প্রযুক্তিবিদদের প্রশংসায় ভাসছেন সুরি। ওপেন সোর্স ডেভেলপার ইয়ান ল্যান্ডসম্যান এক বার্তায় লেখেন, ‘ইন্টারনেটের অধিকাংশ পিএইচপি প্যাকেজ বিতরণের দায়িত্ব এই একজন মানুষের ওপরই নির্ভর করছে। যদি তার কিছু হয়ে যেত, তবে পুরো বিশ্বই বিপদে পড়ত।’
সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওন্দ্রেজ সুরি পুরো ঘটনার বিবরণ ও উন্মুক্ত সফটওয়্যার খাতের ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন।
ওন্দ্রেজ সুরি: চলতি সপ্তাহের শুরুতে পিএইচপি প্রজেক্ট থেকে আমাকে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটির কথা জানানো হয়। তবে মঙ্গলবার দেখা যায়, এই সংক্রান্ত তথ্য আগেই অনলাইনে ফাঁস হয়ে গেছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই সংশোধনমূলক কোড প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সময় কম থাকায় পুরো প্রক্রিয়ায় এক ধরনের তাড়াহুড়া তৈরি হয়েছিল।
ওন্দ্রেজ সুরি: পিএইচপির এই ত্রুটিটি ছিল ‘রিমোট কোড এক্সিকিউশন’ ধরনের। এটি সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এর মাধ্যমে হ্যাকাররা সার্ভারে নিজেদের কোড চালিয়ে পুরো ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। যেহেতু বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট পিএইচপি ব্যবহার করে, তাই এই আক্রমণের প্রভাব হতে পারত সুদূরপ্রসারী।
ওন্দ্রেজ সুরি: আমি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কাজ করছি, ফলে আমার প্রক্রিয়ার অনেকটাই স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড)। তা ছাড়া, আমার নিজের কোনো সার্ভারে পিএইচপি চলে না, তাই ব্যক্তিগতভাবে কোনো চাপ অনুভব করিনি। পিএইচপি প্রজেক্ট মূল কোডটি প্রকাশ করেছিল, আর আমার কাজ ছিল সেটিকে সহজ ও দ্রুত ইনস্টলযোগ্য ‘প্যাকেজ’-এ রূপান্তর করা, যাতে বিশ্বের হাজার হাজার সার্ভারে তা এক ক্লিকেই আপডেট করা যায়। আমি না থাকলেও মানুষ নিজেরা কোড সাজিয়ে নিতে পারত, তবে তাতে অনেক বেশি সময় ও দক্ষতার প্রয়োজন হতো।
ওন্দ্রেজ সুরি: এখন দুটি বিষয়ই খুব দ্রুত ঘটছে। একদিকে আক্রমণকারীরা এআই ব্যবহার করে ত্রুটি খুঁজে বের করছে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষাকারীরাও এআই দিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখছে। তবে আসল সমস্যা হলো, বৈশ্বিক আইটি অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত অর্থ ও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আজকের এই সংকট অনেক দিন ধরেই ঘটার অপেক্ষায় ছিল।
ওন্দ্রেজ সুরি: ওপেন-সোর্স যখন শুরু করেছিলাম তখন তা মজার ছিল। কিন্তু এখন এই কাঠামোটি এক ধরনের শোষণে পরিণত হয়েছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিখরচায় এই সেবা নিলেও মূল ডেভেলপারদের কোনো আর্থিক সহায়তা দেয় না। এই মডেল দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়। যে মানুষগুলো দিনরাত কাজ করছেন, তাঁদের যদি মূল্যায়ন না করা হয়, তবে তাঁরা একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে বিগত ২৪ ঘণ্টায় নজিরবিহীন আর্থিক অনুদান পেলেও সুরি মনে করেন, উন্মুক্ত আইটি অবকাঠামো রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল ও কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি।
সংকট কাটার পর বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছ থেকে ধন্যবাদ বার্তা পাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী কৌতুক করে বলে আমার কোনো আবেগ নেই, তবে এই বার্তাগুলো দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আমার কাজের একটা বড় উদ্দেশ্য রয়েছে।’
সাধারণ ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ—সাইবার নিরাপত্তার এই জটিল সময়ে প্যানিক না করে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা ও আপডেটের ওপর আস্থা রাখা উচিত।