পেশাদার লেখক হিসেবে সারাহ সুজুকি হার্ভার্ড খুব বেশি আবেগী শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। কিন্তু আজকাল তিনি নিজের লেখার চিরচেনা ধরন বদলে ফেলেছেন। উদ্দেশ্য একটাই—এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নিজের লেখাকে ‘মানুষের লেখা’ হিসেবে প্রমাণ করা।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের এই ৩২ বছর বয়সী কপিরাইটার বলেন, ‘আজকাল আমি আমার পোস্টে বা প্রবন্ধে ইচ্ছা করেই চলিত ভাষা-শব্দ ব্যবহার করি। যেমন—‘‘আরে ভাই, সত্যি বলতে’’ অথবা একগাদা বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!) বসিয়ে দিই। এভাবে লিখতে আমার নিজেরই খুব অস্বস্তি লাগে, কিন্তু নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে এখন এটাই করতে হচ্ছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এআই দিয়ে তৈরি লেখার বন্যা বইছে। কে আসল লেখক আর কে চ্যাটবটের সাহায্য নিয়ে লিখছেন, তা ধরার জন্য চারদিকে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ফলে স্বনামধন্য ও সাধারণ লেখকেরা এখন সম্পূর্ণ নতুন এক সংকটে পড়েছেন—কীভাবে নিজের লেখাকে শতভাগ ‘মানবিক’ বা মানুষের লেখা হিসেবে ফুটিয়ে তোলা যায়। লেখকদের কাছে এটি যেন এক ‘উল্টো টিউরিং টেস্ট’।
প্রসঙ্গত, একটি যন্ত্র বা কম্পিউটার প্রোগ্রাম মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করতে পারে কি না, তা যাচাই করা হলো টিউরিং টেস্ট। আর উল্টো টিউরিং টেস্ট (ক্যাপচা) হলো প্রথাগত টিউরিং টেস্টের ঠিক বিপরীত একটি পরীক্ষা। এখানে কোনো যন্ত্র মানুষের বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করে না, বরং একজন মানুষ কম্পিউটার বা যন্ত্রের নির্দেশাবলি অনুসরণ করে প্রমাণ করেন যে—তিনি মানুষ, কোনো স্বয়ংক্রিয় রোবট বা বট নন।
সারাহ হার্ভার্ডের মতো অনেক লেখকই এখন আশঙ্কায় থাকেন, কখন না জানি তাঁদের কষ্টার্জিত লেখার ওপর ‘এআই-নির্মিত’ তকমা সেঁটে দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিকে তিনি সত্তরের দশকের কমিউনিস্টবিরোধী ‘ম্যাককার্থিজম’ অভিযানের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এটি একধরনের উন্মাদনা। মানুষ এমন কিছুর প্রমাণ চাইছে, যা আসলে প্রমাণ করা অসম্ভব।
উচ্চমানের সাহিত্য থেকে শুরু করে সমসাময়িক সম্পাদকীয়—মানুষের লেখা কোটি কোটি নিবন্ধের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে এআই এখন অত্যন্ত দক্ষ লেখক হয়ে উঠেছে। লেখার ভাষা সহজ ও স্পষ্ট রাখার যে চিরন্তন নিয়ম, চ্যাটবটগুলো তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। তবে এই অতিরিক্ত নিখুঁত ও মসৃণ লেখার ধরনই এখন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন—ধারাবাহিকভাবে তিন লাইনের তালিকা তৈরি করা কিংবা চমৎকার লাইনের ব্যবধান দেখলেই মানুষ এখন সন্দেহ করে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে ফ্রান্সের বহুজাতিক প্রকাশনা সংস্থা হাশেত ‘শাই গার্ল’ নামের একটি বই বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়, কারণ, বইটিতে এআই ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল (যদিও লেখক তা অস্বীকার করেছেন)। এদিকে বছরের পর বছর ধরে স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্টের সত্যতা যাচাইয়ে এআই ডিটেক্টর সফটওয়্যার ব্যবহৃত হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
অন্যদিকে, অনেক লেখক চ্যাটবটের নিখুঁত লেখাকে কৃত্রিম ত্রুটি দিয়ে ‘মানবিক’ করার চেষ্টা করছেন। ফ্লোরিডার জ্যাক্সনভিলের ২৮ বছর বয়সী ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট কো-অর্ডিনেটর গ্যারেট মার্সি জানান, তিনি এআইয়ের খসড়া করা লেখার ড্যাশ (—) চিহ্নগুলো বাদ দিয়ে দেন এবং সেখানে নিজের দীর্ঘ ও কিছুটা অগোছালো বাক্য জুড়ে দেন। এমনকি ইচ্ছা করে একটি-দুটি বানান ভুলও রেখে দেন, যাতে লেখাটি মানুষের লেখা বলে মনে হয়।
একইভাবে শিকাগোর ৫৪ বছর বয়সী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা শন চৌ তাঁর লিংকডইন পোস্টের জন্য এআই ব্যবহার করলেও পরে দীর্ঘ ড্যাশগুলোর বদলে দুটি ছোট হাইফেন ব্যবহার করেন, যাতে লেখাটিতে হাতের কাজের বা ‘হস্তশিল্পের’ ছোঁয়া থাকে।
এআই ডিটেকশন স্টার্টআপ রাইটহিউম্যানের প্রতিষ্ঠাতা ইভান জ্যাকসন (২৭) জানান, এআই মডেলগুলো প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে, ফলে বটের লেখা চেনা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন এআই লেখায় ‘বরং’ বা ‘অপরিহার্য’-এর মতো শব্দের অতিব্যবহার দেখা যায়। তবে ভয়ের বিষয় হলো, মানুষ নিজের অজান্তেই এআইয়ের মসৃণ লেখার ধরন অনুকরণ করা শুরু করেছে, যার ফলে মানুষের খাঁটি লেখাও অনেক সময় এআই ডিটেক্টরে ‘কৃত্রিম’ বলে চিহ্নিত হচ্ছে।
মিশিগানের গ্র্যান্ড র্যাপিডসের ৩৩ বছর বয়সী ব্লগার রায়ান জনসন গত বছর চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, এআইয়ের অতিরিক্ত মসৃণ লেখার কারণে তাঁর ব্লগের নিজস্বতা হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এটি সেই রেস্তোরাঁর মতো, যারা একসময় স্যুপে অতিরিক্ত জল মেশাতে শুরু করে। গ্রাহকেরা হয়তো সঙ্গে সঙ্গে চলে যান না, তবে একসময় তাঁরা ঠিকই বোঝেন যে—আগের সেই স্বাদটা আর নেই।’
নিজের লেখাকে এআই-মুক্ত প্রমাণ করতে জনসন এখন লেখায় জনপ্রিয় মার্কিন কমেডি সিরিজ ‘দ্য অফিস’-এর অপ্রচলিত উক্তি ব্যবহার করেন। তা সত্ত্বেও অনেক পাঠক তাঁকে মেসেজ করে জানতে চান, লেখাটি এআইয়ের কি না।
হাসতে হাসতে জনসন বলেন, ‘কয়দিন আগে আমি বাইবেল পড়ছিলাম। সেখানে সেন্ট জেমসের বইয়ে ড্যাশ চিহ্নের ব্যবহার দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগল—এটিও কি এআই দিয়ে লেখা? আসলে ভালো লেখকেরা যুগে যুগে এসব ব্যবহার করে এসেছেন।’
ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল থেকে সংক্ষেপে অনূদিত