ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপসহ বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মের মালিক মার্ক জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান মেটা। এসব প্ল্যাটফর্মে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই বিতর্ক চলছে। এবার এ প্রসঙ্গে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে মেটাকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা করার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর একটি আদালত।
জুরি বোর্ড রায়ে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে এবং তাদের যৌন উদ্দীপক বিষয়বস্তুর মুখোমুখি করা এবং যৌন নিপীড়কদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য দায়ী।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, এই প্রথম কোনো অঙ্গরাজ্য শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে সফল হলো।
মেটার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, কোম্পানিটি এই রায়ের সঙ্গে একমত নয় এবং তারা এর বিরুদ্ধে আপিল করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের প্ল্যাটফর্মে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম করি। ক্ষতিকর ব্যক্তি ও কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমরা স্বচ্ছ। কিশোর-কিশোরীদের অনলাইনে সুরক্ষার বিষয়ে আমাদের রেকর্ডের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।’
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য তাদের প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। এর মাধ্যমে মেটা নিউ মেক্সিকোর ‘আনফেয়ার প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ বা অন্যায্য চর্চা আইন লঙ্ঘন করেছে বলে মনে করে জুরি বোর্ড।
সাত সপ্তাহব্যাপী চলা এই বিচারে জুরিদের সামনে মেটার অভ্যন্তরীণ নথি উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া সাবেক কর্মীদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়, যেখানে উঠে আসে যে প্রতিষ্ঠানটির প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যৌন নিপীড়কেরা শিশুদের টার্গেট করছে, এমনটি মেটা আগে থেকেই জানত।
২০২১ সালে পদত্যাগ করে ‘হুইসেলব্লোয়ার’ বা তথ্য ফাঁসকারী হিসেবে পরিচিতি পান মেটার সাবেক প্রকৌশল প্রধান আর্তুরো বেহার। তিনিও আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি জানান, ইনস্টাগ্রামে চালানো বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের সামনে যৌন কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাও ইনস্টাগ্রামে এক অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে যৌন প্রস্তাব পেয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সরকারি কৌঁসুলিরা মেটার অভ্যন্তরীণ একটি গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন। সেখানে দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট সপ্তাহে ইনস্টাগ্রামের ১৬ শতাংশ ব্যবহারকারী অনাকাঙ্ক্ষিত নগ্নতা বা যৌন কার্যকলাপসংবলিত কনটেন্ট দেখার অভিযোগ করেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা সৃষ্টিকারী ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মোকাবিলা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করেছে।
ইনস্টাগ্রাম ২০২৪ সালে ‘টিন অ্যাকাউন্টস’ চালু করে, যা কিশোর ব্যবহারকারীদের নিজেদের অ্যাকাউন্টের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ দেয়। এ ছাড়া গত মাসে তারা একটি ফিচার চালু করেছে, যার মাধ্যমে কোনো শিশু আত্মহননমূলক বিষয়বস্তু খুঁজলে অভিভাবককে সতর্কবার্তা পাঠানো হবে।
আইন লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার করে কয়েক হাজার লঙ্ঘনের দায়ে জুরি বোর্ড মোট ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের দেওয়ানি জরিমানা নির্ধারণ করেছেন।
মেটা বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেসে আরেকটি পৃথক মামলার মোকাবিলা করছে। সেখানে এক তরুণী অভিযোগ করেছেন, ইনস্টাগ্রাম ও গুগলের মালিকানাধীন ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশাগত কারণে শিশু বয়সে তিনি সেগুলোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আদালতে এমন আরও হাজার হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
২০২৩ সালে নিউ মেক্সিকো মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। এতে অভিযোগ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটি তরুণ ব্যবহারকারীদের যৌনভাবে স্পষ্ট কনটেন্ট, শিশু যৌন নির্যাতনের উপাদান এবং এমনকি এসব কনটেন্টের প্রস্তাব বা মানব পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কনটেন্টের দিকে ‘পরিচালিত’ করেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল তোরেস বলেন, ‘মেটার নির্বাহীরা জানতেন যে তাঁদের পণ্য শিশুদের ক্ষতি করছে, তাঁরা নিজের কর্মীদের সতর্কবার্তাকে পাত্তা দেননি এবং তাঁরা যা জানতেন, সে সম্পর্কে জনগণের কাছে মিথ্যা বলেছেন।’
তোরেস আরও বলেন, ‘আজ জুরি বোর্ডও পরিবার, শিক্ষাবিদ ও শিশু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একমত হয়ে জানিয়ে দিলেন যে যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়।’