২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে ডাক পাওয়ার খবরটা যখন এলো, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ৩৮ বছর বয়সী গোলরক্ষক ওয়েভরতন। আবেগ ধরে রাখতে না পেরে বসার ঘরের সোফার ওপরই উল্টে পড়েন তিনি। সিসিটিভি ক্যামেরায় বন্দি হওয়া সেই নাটকীয় মুহূর্তটি ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।কাতার বিশ্বকাপের পর কার্লো আনচেলত্তির চূড়ান্ত স্কোয়াডে এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষকের অন্তর্ভুক্তি ছিল বড় এক চমক। সম্প্রতি ফিফাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের আবেগঘন প্রত্যাবর্তন, ব্রাজিলের গোলরক্ষকত্রয়ীর রসায়ন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ওয়েভেরতন—
প্রশ্ন: খবরটি পাওয়ার পর কিছুটা সময় কেটে গেছে। এখন আপনার মনে কী চলছে?
ওয়েভেরতন: গত কয়েকটি দিন ভীষণ স্পেশাল ছিল। পুরোটা সময় কেটেছে আনন্দ আর কৃতজ্ঞতায়। আমি ঈশ্বরের কাছে এবং যারা আমাকে এতদূর আসতে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। প্রতিদিন আমি এই ইতিহাস গড়ার সুযোগটি নিয়ে ভাবছি। আমরা এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি, যারা ফুটবলকে অসম্ভব ভালোবাসে। ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপা ঘরে তোলার এই লড়াইয়ে পুরো জাতি আমাদের পাশেই থাকবে।
প্রশ্ন: আপনি এবং নেইমার ২০১৬ রিও অলিম্পিকে সোনা জিতেছিলেন। এবার দুজনে একসঙ্গে বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে নামছেন। তারকাখচিত একটি স্কোয়াডকে কীভাবে চ্যাম্পিয়ন দলে রূপান্তর করা সম্ভব?
ওয়েভেরতন: এটা পুরোপুরি নির্ভর করে দলের মূল উদ্দেশ্যের প্রতি সবার দায়বদ্ধতার ওপর। এখানে ব্যক্তিগত অহংকার ও আত্মতুষ্টি দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। সবাইকে একই সুতোয় গাঁথা হয়ে এক লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে। আমাদের দলে একঝাঁক অসাধারণ খেলোয়াড় আছে, যারা এই সুযোগটি লুফে নিতে এবং ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে নিজেদের নাম খোদাই করতে প্রস্তুত।
প্রশ্ন: ব্রাজিল আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে একই তিন গোলরক্ষকের ওপর আস্থা রেখেছে। কাতারে আলিসন এবং এদেরসনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ওয়েভেরতন: দুর্দান্ত গোলরক্ষক হওয়ার পাশাপাশি ওরা দুজন অসাধারণ মানুষও। বন্ধু হিসেবে ওদের পাশে পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। ২০২২ বিশ্বকাপে আমাদের বোঝাপড়া দারুণ ছিল এবং একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করত। গোলরক্ষক হিসেবে আমরা সবাই জানি, মাঠে সুযোগ পাবে একজনই। কিন্তু অনুশীলনে আমরা প্রতিদিন একে অপরকে আরও ভালো হওয়ার জন্য তাড়না দিই, যেন তিনজনই নিজেদের সেরা ফর্মে থাকতে পারি। যে-ই খেলুক না কেন, বাকি দুজন সবসময় মানসিকভাবে তার পাশে থাকবে।
প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের দীর্ঘ যাত্রায় ব্রাজিলের কোন গোলরক্ষকরা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছেন?
ওয়েভেরতন: আমি এই পজিশনটাকে মন থেকে ভালোবাসি। গোলরক্ষক হওয়া আমাকে জীবনের অনেক বড় শিক্ষা দিয়েছে—প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কীভাবে শক্ত থাকতে হয়, ঘুরে দাঁড়াতে হয় এবং চরম চাপের মুহূর্তে কীভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমি অন্য গোলরক্ষকদের মধ্যেও এই গুণগুলো খুঁজি। সেলেসাও দলে কাটানো সময়ের বেশিরভাগটাই আমি আলিসন ও এদেরসনের পাশে ছিলাম। খুব কাছ থেকে দেখেছি, ওরা কীভাবে অনুশীলন করে এবং মাঠের বাইরেও নিজেদের কীভাবে সামলায়। তবে ছোটবেলায় যারা আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিলেন, তারা হলেন ক্লদিও তাফারেল এবং মার্কোস—যারা যথাক্রমে ১৯৯৪ ও ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি।
প্রশ্ন: পালমেইরাসের সঙ্গে আপনার এত দীর্ঘ ও আবেগঘন সম্পর্ক ছিল। সেখান থেকে গ্রেমিওতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কতটা কঠিন ছিল?
ওয়েভেরতন: পালমেইরাসে আমি যা কিছু অর্জন করেছি, সেই জায়গা থেকে সিদ্ধান্তটা নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন আপনাকে সাহসী হতেই হয়। কখনো কখনো সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলোই আপনাকে সামনে এগিয়ে দেয়। পালমেইরাস এবং তাদের সমর্থকদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমি অনেক প্রার্থনা করেছি, ঈশ্বরের কাছে পথনির্দেশ চেয়েছি। একটা সময় মনে হয়েছে, এটাই আমার জন্য সঠিক পথ। এখন আমি নিশ্চিত, ক্যারিয়ারের জন্য এটি একদম সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।
প্রশ্ন: পালমেইরাসে এনদ্রিক ও দানিলোর মতো তরুণদের আপনি বড় হতে দেখেছেন, পথ দেখিয়েছেন। এবার তাদের সঙ্গে বিশ্বকাপের মঞ্চ ভাগ করে নেওয়াটা কতটা আনন্দের?
ওয়েভেরতন: ওদের আমি চোখের সামনে পালমেইরাসে বড় হতে দেখেছি। আমরা একসঙ্গে ট্রফিও জিতেছি। আমাদের একটা মজার গল্পও আছে—এনদ্রিক মাঠে যতবার গোল করত, আমি ওকে একজোড়া স্নিকার্স উপহার দিতাম। আর দানিলো আসত শপিং মলে জুতো পছন্দ করতে সাহায্য করার জন্য। একটা সময় যখন দেখলাম, সে একের পর এক গোল করেই যাচ্ছে, তখন পকেটের অবস্থা বুঝে আমাকে ওটা বন্ধ করতে হয়েছিল! (হাসি)
আমি এর আগে আলাদাভাবে দানিলো এবং এনদ্রিকের সঙ্গে ব্রাজিল দলে ছিলাম। তবে এবার বিশ্বকাপের মতো মহামঞ্চে ওদের দুজনকে একসঙ্গে পাশে পাওয়াটা সত্যিই দারুণ এক অনুভূতি।