সাক্ষাৎকার

‘ক্রিকেট ডিপ্লোমেসিতে বাংলাদেশ গোল্ড মেডেল পেয়েছে’

আমিনুল ইসলাম বুলবুল যেন কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারছেন এখন। বড় চ্যালেঞ্জিং সময় কেটেছে তাঁর। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে পারার যন্ত্রণা থাকলেও বুলবুল মনে করেন, ক্রিকেট দূতিয়ালিতে বাংলাদেশের যথেষ্ট প্রাপ্তি আছে। বিশ্বকাপ ইস্যুতে গত কয়েক দিনে কী কী ঘটেছে, আজকের পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিসিবি সভাপতি খুলেই বললেন। আজ সকালে বুলবুলের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আজকের পত্রিকার হেড অব স্পোর্টস রানা আব্বাস।

প্রশ্ন: আপনার গলাটা বসে গেছে মনে হচ্ছে?

আমিনুল ইসলাম বুলবুল: হ্যাঁ, শরীরটা একটু খারাপ। আমার এই সফরকে (লাহোর) বলা যায় ‘কাইট ডিপ্লোমেসি।’ একসময়ে চীন আর আমেরিকার (১৯৭১ সালে) মধ্যে ‘পিং-পং ডিপ্লোমেসি’ ছিল না? আমাদের ক্ষেত্রে এটা কাইট ডিপ্লোমেসি। আমাকে সোজা বিমানবন্দর (লাহোর) থেকে কড়া নিরাপত্তা ও দারুণ অভ্যর্থনা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি গিয়েছিলাম ওখানে, ঘুরলাম-ফিরলাম, পাকিস্তানি জনগণের মুখে হাসি দেখলাম। একটা যে সম্পর্ক তৈরি করা, একটা বিশ্বাস স্থাপন করা। কাইট ডিপ্লোমেসি হয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রিকেট নিয়ে—এটা দারুণ ব্যাপার।

প্রশ্ন: এ কদিন অনেক টেনশনের মুহূর্ত গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে।

বুলবুল: হ্যাঁ, টেনশন মানে, প্রথম থেকে বলি, যখন আমরা বললাম যে নিরাপত্তার কারণে সরকার আমাদের যেতে বারণ করছে। তার পর থেকে নিয়মিত কথাবার্তা চলছিল সবার মধ্যে। পাকিস্তান বলেছিল যে বাংলাদেশের জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম আমরা লাহোরে, সেখানে আইসিসির কেউ কেউ অনলাইনে ছিল, আমাদের সামনে আসছিল না। তবে ভাইস চেয়ারম্যান (ইমরান খাজা) সামনে ছিল। মিটিংয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড আর আমি ছিলাম। বিস্তারিত বলতে পারব না, প্রাইভেসি আছে—যাতে আমাদের আর্থিক ক্ষতি যেন না হয়, সেটা কীভাবে কাভার করা যায়, কীভাবে আরও ইভেন্ট দেওয়া যায়, বাংলাদেশকে নিয়ে তারা যে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে হয়তো কিছু দেশ বাংলাদেশে আসবে না খেলতে। তো এ ধরনের কিছু সিদ্ধান্ত অফিশিয়াল না হলেও সবকিছু ওভারকাম করার পরে পাকিস্তানকে অনুরোধ করেছিলাম ভারতের সঙ্গে খেলতে এবং সেটাই শেষ আধা ঘণ্টা ধরে বোঝানো হয়েছে তাদেরকে।

প্রশ্ন: আপনারা প্রথম বিবৃতিটা দিলেন। সেখানে পাকিস্তানকে অনুরোধ করলেন খেলতে। কিন্তু এখানে একটা ভুল-বোঝাবুঝিরও অবকাশ তৈরি হয়েছিল।

বুলবুল: এটা একটা প্রসেসিং যে আমরা প্রেস কনফারেন্স করব, প্রেস রিলিজ দেব। বিবৃতিটা হবে যে পাকিস্তানকে রিকোয়েস্ট করে, পাকিস্তান তাতে রাজি হবে, তারপর আইসিসি বিবৃতি দেবে। আইসিসি কীভাবে আমাদের আগে বিবৃতি দেবে এ ক্ষেত্রে? ইটস আ প্রসেস।

প্রশ্ন: গত ৩ জানুয়ারিতে মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল থেকে বাদ পড়ার দিনে আপনি সিলেটে ছিলেন। প্রথম দিনে কিন্তু আপনাদের প্রতিক্রিয়াটা ছিল খুবই সাধারণ, সতর্ক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু পরের দিন ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার প্রতিক্রিয়াটা অনেক কড়া হয়ে গেল। এখন ঘটনার পূর্বাপর বলা যায় নিশ্চয়ই?

বুলবুল: আমরা একটা ক্রীড়া সংস্থা, তা-ই না? আমাদের কাজ হচ্ছে ক্রিকেট রান করা এবং সেই লক্ষ্যে আমরা আমাদের জায়গায় সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার হচ্ছে আমাদের অভিভাবক। বাংলাদেশ সরকার আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জানে, অনেক বেশি এরিয়া নিয়ে চিন্তা করে। শুধু খেলোয়াড় বা খেলা নিয়ে না, এখানে ওভার অল আমাদের হিউম্যান ইকোসিস্টেম, মানে নাগরিকদের সব ইকোসিস্টেম, সবার সিকিউরিটি নিয়ে ভাবে। তো সবকিছু চিন্তা করে সরকার যখন আমাদের সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে এখানে দল যাবে না, তখন তো আমাদের সেটা মেনে নিতেই হবে। কারণ, ক্রিকেট তো আগে না, আগে দেশ। উই হ্যাড টু টেক দিস ডিসিশন উইথ দ্য গভর্নমেন্ট।

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল

প্রশ্ন: টোটাল ক্রিকেট ইকোসিস্টেমে ভারতের যে আধিপত্যের কথা শোনা যায়, তাদের বিরুদ্ধে এত জোরালো প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে দেখা যায়নি। আপনি নিজেই আইসিসির ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের কথা বলেছেন। এই যে জোরালো প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতকে বার্তা দেওয়ার যে চেষ্টা, এটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

বুলবুল: এই মেসেজটা বলব যে আমাদের জয়ী বলা যাবে না, আমরা এস্টাবলিশ করতে পেরেছি। কেন? বলি। আমরা যখন বলেছিলাম যে সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে আমরা খেলব না, আমরা খেলার জন্য রাজি আছি, তখন কিন্তু আইসিসির একটা পক্ষ হয়তো চিন্তা করেছিল যে এমন একটা স্টেপ নিতে হবে বা এই ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাতে ভবিষ্যতে কেউ না যায়। সেটা হুটহাট দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ হতে পারে, আর্থিক বিষয় হতে পারে, কমার্শিয়াল বিষয় হতে পারে। অবশ্যই মোটামুটি অভাবিত ছিল (ভারতের কাছে)। প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে আরেকটা দিকে বেনিফিট নিয়ে আসা বড় সাফল্য। হয়তো বাংলাদেশের কিছু কিছু মানুষ এটা দেখতে পারছে না বা দেখার চেষ্টা করছে না। বাট দিস ইজ আ ম্যাসিভ ভিক্টরি (বড় সাফল্য)। হ্যাঁ, বিশ্বকাপ আমরা খেলতে পারিনি, এটা আমাদের উচ্চতর সরকারি সিদ্ধান্ত, আমরা রেসপেক্ট করেছি। তবে এই যে একটা পুরা সিস্টেমের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে অটল রেখে বের হয়ে আসা ঠিক বিশ্বকাপের মাঝে, আমি বলব একটা বিশাল সাফল্য।

প্রশ্ন: ক্রিকেট ডিপ্লোমেসিতে পিছিয়ে থাকার খেসারত দিয়ে বিশ্বকাপ খেলা হলো না—এ রকম একটা কথাও কিন্তু শোনা যায়।

বুলবুল: আমার মনে হয় ক্রিকেট ডিপ্লোমেসিতে আমরা গোল্ড মেডেল পেয়েছি। যাঁদের আপনারা অবহেলা করেছেন, তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন শেষ অবধি (ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ আয়োজনে বাংলাদেশের শরণ)।

প্রশ্ন: কঠিন এ সময়ে নিজের বোর্ড থেকে কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন?

বুলবুল: আমাদের বোর্ডের সিইও (প্রধান নির্বাহী) সব সময় কমিউনিকেশনে ছিলেন, যেটা বাই ডিফল্ট তিনি থাকেন। আমাদের দুজন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, ক্রিকেট অপারেশনসকে তো সব সময় আপডেট দিতাম বিভিন্ন মিটিংয়ের। আইসিসির সঙ্গে সভাগুলোয় তাদের সম্পৃক্ত করতাম। বোর্ডকে যতটা পেরেছি, আপডেটেড রেখেছি। বোর্ডের সেই আত্মবিশ্বাস আমার ওপরে ছিল। সাহায্য-সহযোগিতা সবাই করেছে। আই অ্যাম রিয়েলি গ্রেটফুল টু মাই ওয়ান্ডারফুল টিম।

পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির সঙ্গে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। ফাইল ছবি

প্রশ্ন: সবকিছুর পরও আপনার কতটা আফসোস হচ্ছে যে লাহোরের সভাটা যদি পাঁচটা দিন আগে হতো? তাহলেও হয়তো দল বিশ্বকাপে যেত।

বুলবুল: না, এ ধরনের কোনো টাইমলাইন বা টাইম ফ্রেম ছিল না। পরিস্থিতি অনুযায়ী সব ঘটেছে। আমি কিন্তু চেয়েছিলাম যে...স্কটল্যান্ডকে না নেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তান এবং শুরুতে ভারত ও আইসিসির কিছু কর্মকর্তারা বলেছিল যে অপেক্ষা করতে। কিন্তু আইসিসির তো কমার্শিয়াল ও লজিস্টিক্যাল ব্যাপার থাকে। খেলা না হলে অনেক ক্ষতি। তাদের দিক থেকে তারা দেখেছে। যখন (৭ ফেব্রুয়ারি) স্কটল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়ে টস করতে গেল, তখনই শুধু আমার মনে হয়েছে, তাহলে বাংলাদেশ খেলছে না! তার আগ পর্যন্ত সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি যাতে বাংলাদেশ এক দিনের নোটিশে হলেও যেন বিশ্বকাপ যায়। বলে নিই যে যে দুটো দেশ আমাদের সঙ্গে গোপনে গোপনে মানে ব্যাক মিটিংয়ে সব সময় যোগাযোগ করত—আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ে। তারাও একপর্যায়ে ক্রিকেটের স্বার্থে তারাও চেয়েছিল যাতে গ্রুপটা চেঞ্জ হয়। যাতে বাংলাদেশ ‘বি’ গ্রুপে যায়। তো সেটাও হয়নি আর কি।

প্রশ্ন: ওদের কাছে তো আপনারা এর আগেও অনুরোধ করেছিলেন গ্রুপ অদলবদল করতে।

বুলবুল: আয়ারল্যান্ডের কাছে তো আমার ই-মেইলই ছিল। তারা খুশি মনে করতেও চেয়েছিল। কিন্তু সামহাউ হয়নি, কেন? জানি না।

প্রশ্ন: সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে যে তারা রাজি নয় বাংলাদেশের সঙ্গে গ্রুপ অদলবদল করতে।

বুলবুল: যখন রাজি না সেটা এসেছে, যখন রাজি ছিল সেটা আর আসেনি। আমার কাছে ই-মেইল আছে।

প্রশ্ন: তার মানে বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া খুবই সম্ভব ছিল। এখানে কি আয়োজক দেশের কাছে যুক্তির চেয়ে ‘ইগো’ বড় হয়ে উঠেছিল?

বুলবুল: হ্যাঁ, তাই হবে হয়তো।

প্রশ্ন: লাহোরে বিসিবির দাবি আইসিসি মেনেছে, পাকিস্তানও খেলবে ভারতের সঙ্গে। ভারত বাংলাদেশের জন্য ভেন্যু পরিবর্তন করেনি—সব অংশীজনেরই উইন-উইন সিচুয়েশন তাহলে। কিন্তু চরম সত্যটা হলো, লিটন-মোস্তাফিজদের জীবন থেকে একটা বিশ্বকাপ হারিয়ে গেল। আপনি এখন ক্রিকেট প্রশাসক হলেও সাবেক খেলোয়াড় ও সাবেক অধিনায়ক হিসেবে ওদের জন্য কতটা খারাপ লাগছে?

বুলবুল: সমব্যথী, আমি সমব্যথী। একজন সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে মনে হচ্ছে এটা বড় দুঃখজনক ঘটনা। তবে আমি আবারও বলছি যে দেশ-জাতির সম্মান ক্রিকেটের চেয়ে অনেক বড় একটা ব্যাপার এবং একটা বিশ্বকাপ খেলার চেয়ে সরকারের সিদ্ধান্তটা অনেক বড় করে দেখছি।

প্রশ্ন: সমাধানের পর সরকারের তরফ থেকে কি কোনো মেসেজ পেয়েছেন?

বুলবুল: সরকার সব সময় হেল্পফুল ছিল এবং এই লাহোর মিটিংয়ে যাওয়ার আগেও আমি জানিয়ে গিয়েছি আমার অ্যাজেন্ডা কী। আমি কী অর্জন করতে পারি বা কী হারাতে পারি—সব আলোচনা করে গিয়েছি।

‘কোনো অতৃপ্তি নেই মনের ভেতরে, আমি তৃপ্ত’

‘এর মানে, ক্রিকেট বোর্ডে সরকারি হস্তক্ষেপ, বিষয়টা আইসিসিতে যাওয়া উচিত’

‘আপনাদের পার্সোনাল অ্যাজেন্ডা থাকতে পারে, তবে খেলা যেন সময়মতো মাঠে গড়ায়’

‘সারা জীবনই আফসোসটা থেকে যাবে’

৫ বছরে সিনিয়র বিশ্বকাপে খেলা সম্ভব

সবাই কথা বলার অভ্যাসটা গড়ে তুলছে

‘একটু ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছিল, ঠিক হয়ে গেছে’

আমাকে হকির হামজা ডাকলে গর্বিত হই

ঘরোয়া লিগও ভালো জায়গায় নেওয়া উচিত: রাকিব হোসেন

সামনে আরও অনেক কিছু আসছে: ভারতকে হারানোর নায়ক মোরসালিন