সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দুবার বড় সাফল্য পাওয়ার পর এশিয়ার সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেদের ঝলক দেখাতে চায় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেবেন আফঈদা খন্দকার। অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে বাফুফে ভবনে আজকের পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দলের প্রস্তুতি, প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার সোহাগ।
প্রশ্ন: সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দুবার সাফল্য পেয়েছেন। এখন এশিয়ান কাপের মতো বড় মঞ্চে অধিনায়ক হিসেবে খেলতে যাচ্ছেন। কতটা গর্বের? কতটা রোমাঞ্চ অনুভব হচ্ছে?
আফঈদা খন্দকার: গর্বের বিষয় শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, পুরো দেশের জন্য এটি গর্বের বিষয়। যেহেতু প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল এশিয়া কাপে কোয়ালিফাই করছে।
প্রশ্ন: এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছেন গত জুলাইয়ে। প্রায় ৯ মাসে আপনারা কীভাবে নিজেদের তৈরি করলেন?
আফঈদা: এই সময়ে আমরা অনেক ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলেছি, তারপর চট্টগ্রামে গিয়ে ক্যাম্প করেছি। নারী লিগও হয়েছে মাঝে, তো মোটামুটি ভালোই।
প্রশ্ন: দলে অনেক সিনিয়র খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা অভিজ্ঞ; আবার অনেক নতুন মুখ আছেন, যাঁরা আপনার অনুজ। অধিনায়ক হিসেবে বিষয়টা কীভাবে সামলান?
আফঈদা: পর্দার আড়ালে তো ভূমিকা রাখতেই হয় সব সময়। যেহেতু সিনিয়র খেলোয়াড়েরা আছেন, জুনিয়ররাও। সবাইকে এক করতে গেলে পর্দার আড়ালে অনেক কাজ করতে হয়। সিনিয়রদের সঙ্গে সব সময় পরামর্শ করি যে আপু এটা করলে কেমন হয়, ওটা করলে কেমন হয়। তাঁরা যেটা বলেন, সেটাই করে থাকি।
প্রশ্ন: কঠিন সময়ে কীভাবে মনোবল ধরে রাখেন?
আফঈদা: সবার আগে আমি যদি নিজেকে স্ট্রং রাখি, তাহলে আমার টিমমেটদের স্ট্রং করতে পারব। তো সব সময় আমি চেষ্টা করি, নিজেকে স্ট্রং রাখা আর টিমমেটদের সেভাবে উদ্বুদ্ধ করতে।
প্রশ্ন: কোচ পিটার বাটলার এখন যেভাবে ‘হাই লাইন ডিফেন্সে’ খেলাচ্ছেন আপনাদের, এভাবে খেললে এশিয়ান কাপে বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভালো করা সম্ভব?
আফঈদা: আমরা এটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। পিটার (বাটলার) স্যারের সঙ্গে আমরা অনেক দিন ধরে কাজ করছি, দুই বছরের মতো হচ্ছে। তো এটা নিয়ে আমাদের তেমন কোনো সমস্যা নাই। যদি আমরা বেশি রক্ষণাত্মক খেলি, তাহলে প্রতিপক্ষ আমাদের ওপর পেয়ে বসবে, তারা আমাদের ওপর বেশি চাপ দেবে। আমরাও যদি তাদের ওপর চাপ দিয়ে খেলি, তাহলে তারাও একটু রক্ষণ করতে বাধ্য হবে। (এশিয়ান কাপে) কোচ ঠিক করবেন, তিনি কোন দর্শনে খেলাবেন, কোন ফরমেশনে দল সাজাবেন। আমরা মানিয়ে নিতে প্রস্তুত।
প্রশ্ন: কৌশল নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত মত কী?
আফঈদা: কোচের সঙ্গে অবশ্যই আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলি সব সময়, খেলার আগে বা খেলার পরে হোক। মাঠে যে ভুলত্রুটি হয়, সেগুলো যেন পরের ম্যাচে না হয়। কোচও আমাদের সঙ্গে শেয়ার করে যে কোনটা করলে ভালো হয়, কোনটা করলে খারাপ হয়। এটা আমরা অনুশীলন করে দেখি যে এটা করলে আমরা কি ওই দলগুলোর সঙ্গে খেলতে পারব কি না।
প্রশ্ন: প্রবাসী ফুটবলার হিসেবে আনিকা রানিয়াকে নিয়ে বেশ একটা উন্মাদনা আছে। আপনার সঙ্গে তাঁর বেশ ভালো বন্ধুত্ব দেখলাম।
আফঈদা: হ্যাঁ, সে আমার রুমমেট, আমরা একসঙ্গে থাকি সব সময়। আমাদের ভালো বন্ধুত্ব। আরও কয়েকজন আছে, যারা বেশি মিশে থাকে ওর সঙ্গে। ও যখন প্রথম বাংলাদেশে আসে ট্রায়ালের জন্য তো সব সময় ওকে সাপোর্ট করেছি, যেন সে একা বোধ না করে। আমরা সবাই ওর অপরিচিত। অপরিচিতদের মধ্যে যদি কেউ থাকে, তাহলে সে অস্বস্তি অনুভব করবে সব জায়গায়, এটাই স্বাভাবিক। সেটা অনুশীলনে হোক বা জিম সেশনে। আমি সব সময় ওর সঙ্গে থেকেছি, ওকে সাপোর্ট করেছি, সহায়তার চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন: আপনার সামনে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ—জাতীয় দলের হয়ে এশিয়ান কাপ, আবার অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপও রয়েছে। দুটো টুর্নামেন্টের চিন্তা একসঙ্গে তো করা যায় না। সিনিয়রদের এশিয়ান কাপে পূর্ণ মনোযোগ রেখে কীভাবে তৈরি হচ্ছেন?
আফঈদা: আমরা অনূর্ধ্ব-২০ এবং সিনিয়র টিম—দুই দলই একসঙ্গে অনেক দিন ধরে অনুশীলন করছি। যেহেতু দুই দলই কোয়ালিফাই করেছে, শুরু থেকে আমাদের প্রস্তুতি একসঙ্গে চলছে। সিনিয়র টিমে অনূর্ধ্ব-২০ দলের অনেক খেলোয়াড় আছে, দুই দলের মধ্যেই বন্ডিং খুব ভালো। এটা আমাদের একটা প্লাস পয়েন্ট যে জুনিয়ররা অভিজ্ঞ আপুদের সঙ্গে থেকে অনেক কিছু শিখতে পারছে। আপাতত দুই দলকে আলাদা করে ভাবার চাপ নেই, এই বন্ডিং দলের জন্যই ভালো হচ্ছে।
প্রশ্ন: প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে খেলবে বাংলাদেশ। চমক দেওয়া কি সম্ভব?
আফঈদা: ইনশা আল্লাহ আমরা চেষ্টা করব। যেহেতু প্রথমবারের মতো কোয়ালিফাই করছি, প্রথমবারের মতো খেলতে যাচ্ছি। চীন, উত্তর কোরিয়া, উজবেকিস্তান—ওরা অনেক শক্তিশালী দল। আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব ভালো খেলার। এক দিনে তো আর সাফল্য আসে না। অনেক বাধা পেরিয়ে আজ আমরা এত দূর এসেছি। তো প্রথমবারেই যদি আমাদের নিয়ে বড় কিছু চিন্তা বা আশা করা হয়, আমাদের ওপর এক প্রকার চাপ দেওয়া হয়। চাপ না নিয়ে আমরা যেন আমাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারি সেখানে, সেই লক্ষ্য রাখতে হবে। এশিয়ার মঞ্চে যেন তুলে ধরতে পারি বাংলাদেশকে।
প্রশ্ন: প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির মেলবন্ধন যা-ই হোক, আপনার কি মনে হয়, এখন থেকে বাংলাদেশ নিয়মিত এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করার সামর্থ্য রাখে? আর প্রস্তুতি নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট?
আফঈদা: ইনশা আল্লাহ অবশ্যই চেষ্টা করবে, প্রতিবছর যেন এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করা যায়। যেটা (প্রস্তুতির) ঘাটতি থেকে গেছে সেটা অতীত, এখন আমাদের মূল ফোকাস হচ্ছে এশিয়ান কাপ।
প্রশ্ন: এত সাফল্যের পরও মেয়েদের ফুটবলকে এখনো ঢেলে সাজানো যাচ্ছে না। এটা নিয়ে কতটা খারাপ লাগে আপনার?
আফঈদা: আমাদের দেশটা আসলে পুরুষতান্ত্রিক, এ জন্য মেয়েদের প্রতি অবহেলা থেকেই গেছে। মেয়েদের প্রতি একটু আলাদা নজর দেওয়া উচিত। কারণ, মেয়েরা এত সাফল্য এনে দিচ্ছে। মেয়েদের প্রতি একটু আলাদা নজর যেন রাখা হয়।