ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরে ও বাইরে—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ সামলাচ্ছেন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। গতকাল আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত বিসিবি সভাপতির সাক্ষাৎকারজুড়ে ছিল বিশ্বকাপ ইস্যু। আজ থাকল বিসিবির অভ্যন্তরীণ বিষয়। বুলবুল সবিস্তার বলেছেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিসিবির দূরত্ব, জাতীয় নির্বাচনের পর বোর্ডের ভবিষ্যৎসহ প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রানা আব্বাস।
প্রশ্ন: এত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দেশের ক্রিকেট যাচ্ছে, আপনি নিজেই বলেছিলেন একবার—একটা দিন ভালো যায় তো আরেকটা দিন খারাপ। ক্রমাগত বোর্ডের বাইরের কিংবা অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ আপনার সামনে। এত চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের খুব কম সভাপতিকেই পড়তে হয়েছে। পথটা এত কাঁটায় বিছানো থাকবে, ভেবেছিলেন?
আমিনুল ইসলাম বুলবুল: এই জার্নি যতটা মসৃণ হওয়া উচিত ছিল...(বিসিবির) নির্বাচনের আগে থেকে এ পর্যন্ত একটা ফোর্স সব সময় ডিস্টার্ব করেছে, দুষ্টামি করেছে আমি বলব! মনে হয়, অপেশাদারি আচরণ করে যাচ্ছে তারা। একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখছে, যেটা দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে করা উচিত নয়। একটা দেশ যখন সিদ্ধান্ত নেয়, দেশের স্বার্থে সবাই সেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। ক্রিকেট বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেয়, দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে মেনে নেওয়া কিংবা সেই লক্ষ্যে এগোনো উচিত। ক্রিকেটের স্বার্থ সবার আগে দেখা দরকার। মনে হচ্ছে, একটা এক্সটার্নাল ফোর্স অহেতুক ডিস্টার্ব করেছে। যেভাবে আমাদের ক্রিকেটের বাইরের বিষয়গুলো দেখা হচ্ছে। ক্রিকেট বোর্ড যে একটা ক্রীড়া সংস্থা, এটা ভুলে মনে হচ্ছে, একটা রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে গেছি! ক্রিকেট নিয়ে তানজিদ তামিমের ১০০ বা রিশাদ হোসেনের বোলিং নিয়ে আজকাল আলোচনা হয় না। আলোচনা হয় অন্য কিছু নিয়ে। দুঃখজনক। তবে যারা করছে, তারা হয়তো একসময় অনুশোচনা করবে।
প্রশ্ন: ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ থাকবে কি না—এ রকম একটা কথা বিসিবির নির্বাচনের পর থেকেই শোনা গেছে। এ বিষয়ে কী ভাবছেন?
বুলবুল: এ ধরনের আলোচনা হওয়ায়ই উচিত নয়। একটা নির্বাচিত ক্রিকেট বোর্ড, যারা চার বছরের জন্য ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছে। (জাতীয়) নির্বাচনের সঙ্গে এটার তো কোনো সম্পর্ক দেখছি না। আর সরকারি হস্তক্ষেপ কখনোই হয় না বাংলাদেশ ক্রিকেটে, হবেও না। আইসিসির যে রেগুলেশনস আছে, সেটির মধ্যেই আমাদের থাকা উচিত।
প্রশ্ন: দেশের নির্বাচনমুখী পরিবেশে বিনিয়োগে মন্দা থাকে, এটাই স্বাভাবিক। ঠিক এই সময়ে বড় বড় কিছু টুর্নামেন্ট আপনাদের মাঠে রাখতে হয়েছে। টুর্নামেন্টগুলো আয়োজন করতে হয়েছে বোর্ডের সঞ্চয় থেকে। বিপিএল লাভজনক হয়নি, বোর্ডের আয়ের বিপরীতে ব্যয় বেড়েছে। খেলা মাঠেও রাখতে হচ্ছে; আবার আপনি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারছেন না—এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে উতরানোর চিন্তা করছেন?
বুলবুল: এসিসির ইভেন্টে আগে আমরা দেড় মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৮ কোটি টাকা) পেতাম, এবার কিন্তু আমরা সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন ডলার (৬০ কোটি টাকা) পেয়েছি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কেন টাকা আয় করে? নট টু সেভ মানি, টু ইনভেস্ট মানি। এখন দেশের ইকোনমি হয়তো স্থবির হয়ে আছে নির্বাচনমুখী পরিস্থিতিতে। মানুষ বিনিয়োগ করছে, তবে একটু কম। তাই বলে ক্রিকেট থেমে থাকবে না। হ্যাঁ, কিছু কিছু ইভেন্টে লস করেছি, কিছু কিছু ইভেন্টে লাভও হয়েছে। তো ক্রিকেট আগে এবং ক্রিকেটের স্বার্থে আমাদের আর্থিক লাভের চেয়ে ক্রিকেটটা চালু রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যে সবাই একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করে চলেছি।
প্রশ্ন: অভ্যন্তরীণ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সহকর্মীদের নিয়ে। আপনাকে মাঝে মাঝে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে বোর্ডের কয়েকজন পরিচালকের কথা বা কার্যক্রম নিয়ে।
বুলবুল: দেখুন, আমাদের যে গঠনতন্ত্র আছে, সেটিতে সবকিছুই আছে। তবে সেখানে বোর্ড ডিরেক্টরদের টার্মস অব রেফারেন্স নেই। যেহেতু নেই, আর বোর্ডে তো সবাই বিজ্ঞ। এটা তো স্কুল নয় যে কেউ স্কুলিং করবে, এটা পুলিশের প্রতিষ্ঠান নয় যে পুলিশিং করবে। আমরা যতটা পারি, নিজেদের মধ্যে সেটা আলোচনা করি এবং দেখবেন, পুনরাবৃত্তি খুব একটা হয় না। তো সবাই কথা শোনার চেষ্টা করে।
প্রশ্ন: সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আপনাদের এই বোর্ডের একটা দূরত্ব বেশ স্পষ্ট হয়েছে। সংবাদমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে ক্রিকেট বোর্ডের অনেক ঘটনা ঘটেছে। আর বিসিবি যেকোনো ঘটনায় এত বিবৃতি দিচ্ছে যে আগে ততটা দেখা যায়নি। সামগ্রিকভাবে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণেই কি বিবৃতি দিয়ে বারবার নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হচ্ছে?
বুলবুল: এটা আমাদের মিডিয়া বিভাগের সিদ্ধান্ত। মিডিয়া বিভাগ মনে করে, কথা টুইস্ট করা হয়। দেখবেন যে একটা মানুষের যদি কোনো উত্তর থাকে, সেটাই শুধু দেখানো হয়। উত্তরের সঙ্গে যে প্রশ্নটা (সাংবাদিকের) থাকে, সেটা কখনো দেখানো হয় না। কী প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে উত্তরটা দেওয়া হচ্ছে, সেটা শোনানো বা দেখানো হয় না। তো আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের যদি কিছু বলার থাকে, সেটা লিখিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেব। এ কারণেই বেশি বেশি প্রেস রিলিজ দিচ্ছি, যাতে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে। আর মিডিয়ার সঙ্গে দূরত্ব যেটা, আমরা তো কোনো গ্যাপ দেখি না। এখন কেউ যদি গ্যাপ সৃষ্টি করে—আমরা ভাবি, মিডিয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রিমিয়ার লিগের জন্য দেখেন, আমরা অপেক্ষা করে বসে আছি, ক্লাবগুলো আসছে না। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট বলেন, এনসিএল বলেন, বিপিএল বলেন—সবকিছুই তো ভালোভাবে চলছে। ‘কোয়াব’ চেষ্টা করছে ক্রিকেটারদের খেলার স্বার্থটা দেখতে। কিন্তু ক্লাবগুলো যে খেলতে আসছে না, তাদের ব্যাপারে কেউ কিছু বলছে না কিংবা তাদের কোনো প্রেশার দেওয়া হচ্ছে না। আর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব দেখি না, আমাদের দরজা সব সময় খোলা। তবে আমাদের নীতিমালার মধ্যে থাকতে চাই।
একটা নির্বাচিত বোর্ড, যারা চার বছরের জন্য ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছে, তো এই জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে এটার তো কোনো সম্পর্ক দেখছি না। আর সরকারি হস্তক্ষেপ কখনোই হয় না বাংলাদেশ ক্রিকেটে, হবেও না। আইসিসির যে রেগুলেশনস আছে, সেই রেগুলেশনসের মধ্যেই আমাদের থাকা উচিত।
প্রশ্ন: বিসিবির ‘ট্রিপল সেঞ্চুরি প্রোগ্রাম’ বাস্তবায়নে কতটা এগোনো গেল?
বুলবুল: এই যে আমাদের ‘ট্রিপল সেঞ্চুরি প্রোগ্রাম’, সেটাতে এক নম্বর প্রোগ্রাম ছিল খেলাটা পরিচ্ছন্ন রাখা। দেখবেন, এবার বিপিএলে ৮২ শতাংশ গ্যাম্বলিং কমে গেছে। ‘হাই পারফরম্যান্স ফর অল’ প্রোগ্রামের আওতায় আমরা অলরেডি লেভেল থ্রি কোর্স করেছি, বিভিন্ন জায়গায় সেটআপ করেছি। কীভাবে এই হাই পারফরম্যান্স সিস্টেম তৈরি করা যায়। সদ্য সমাপ্ত ‘অদম্য কাপ’ও তারই একটা অংশ। তিন নম্বর প্রোগ্রাম ছিল ‘কানেক্ট অ্যান্ড গ্রো’। আমরা আটটা অঞ্চল করতে চাইছি। একটা এরই মধ্যে উদ্বোধন করেছি। তারা স্কুল ক্রিকেট চালু করে দিয়েছে সিলেটে। খুব তাড়াতাড়ি আমরা রংপুর এবং অন্য জায়গায় শুরু করে দেব। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে একটা নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছি। উত্তরবঙ্গে দুটি বড় বিভাগ আছে—রংপুর ও রাজশাহী। এই দুটি নিয়ে আমরা চিন্তা করছি ‘নর্থ বেঙ্গল প্রিমিয়ার লিগ’ চালু করার। যেখানে চার-পাঁচটা ফ্র্যাঞ্চাইজি থাকবে। সাউদার্ন প্রিমিয়ার লিগ করার চিন্তা করছি বরিশাল-খুলনা মিলিয়ে। চট্টগ্রাম অনেক সম্ভাবনাময়, সেখানেও হবে। ঢাকা ও ময়মনসিংহে সেন্ট্রাল লিগ হবে। তো আমরা বেশ কিছু কানেক্ট অ্যান্ড গ্রো প্রোগ্রামের মধ্যে ডিসেন্ট্রালাইজেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় লিগ চালু করব। অনেক জেলায় ৫ লাখ টাকা করে দিচ্ছি এবং যে জেলা মেয়েদের ক্রিকেট চালাবে, মিনিমাম তিনটা ইভেন্ট—সব সাপোর্ট বিসিবি দেবে। বিসিবিকে একটা বিশ্বমানের ক্রীড়া সংস্থা করার লক্ষ্যে এইচআর রিভিউ থেকে শুরু করে সব হয়ে গেছে। হেড অব এইচআর, সিএফও, হেড অব ডিজিটাল, হেড অব মার্কেটিং, হেড অব প্রকিউরমেন্ট, হেড অব আইটি—সব গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক নিয়োগের ধাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। ‘ট্রিপল সেঞ্চুরি’র চারটা প্রোগ্রামই ভালো চলছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিদের প্রতিদিন অফিস করতে তেমন দেখা যায়নি অতীতে। এর আগে এমনও একজন বিসিবি সভাপতিকে দেখেছি, যিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজের বাড়ির গ্যারেজে বসে সংবাদমাধ্যমকে দিয়েছেন। সেখানে অস্ট্রেলিয়ায় আপনার পরিবারের কাছে যাওয়াও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে! বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
বুলবুল: এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার (পরিবারের কাছে যাওয়া)। আর ক্রিকেট বোর্ডে প্রতিদিন সকাল ১০টা বা ১১টা থেকে অফিস শুরু করি, অনেক সময় রাত ১২টার সময় ফিরি। একটা বোর্ডে নতুন একটা কাঠামো দাঁড়াচ্ছে, এখানে সবাই মিলে নতুন লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। বিসর্জন দিয়েছি আমার চাকরিটা (আইসিসিতে), স্যাক্রিফাইস করেছি অনেক কিছু। আমি অবৈতনিক বোর্ড সভাপতি। সেখানে আমার কোনো ভাতা নেই। এখানে থাকা-খাওয়ার খরচ নিজেই বহন করি। জমানো টাকা দিয়ে চলছে। সেই টাকাও শেষ হয়ে যাবে। এটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে, আমি সার্ভ করতে এসেছি। যত দিন পারি সার্ভ করব। যখন মনে হবে, চলে যাব। আমার কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, ক্ষমতা নেই। আমার শক্তি একটাই—সততা আর এত বছরের ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা। আমাদের টিম পরিচালকদের নিয়ে, ক্রিকেট বোর্ডের কর্মীদের নিয়ে গড়া।
একটা বিষয়ে বলি, আপনি একজন সংবাদকর্মী—আমি কিন্তু আমাদের সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে একটা গ্যাপ দেখতে পাচ্ছি। তাঁদের কথা হয় আপনারা (সংবাদমাধ্যম) শুনতে পাচ্ছেন না, না হয় আপনাদের কথা তাঁরা বুঝতে পারছেন না। আপনাদের উচিত মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া, সঠিক চিন্তার খোরাক জোগানো। আমি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ; যাঁরা আমাকে, আমাদের এই ক্রিকেট বোর্ডকে, ক্রিকেটকে অনেক ভালোবাসেন এবং সাপোর্ট করেন। সত্যি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ।