বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর লড়াই মানেই ভুলের সুযোগ কম। আর প্রতিপক্ষ যদি হয় জার্মানিকে হারিয়ে আসা আত্মবিশ্বাসী দল, তাহলে ফেবারিটের তকমাও খুব বেশি নিশ্চয়তা দিতে পারে না। ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে আজ রাত ৩টায় এমনই এক লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ে।
একদিকে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই যাদের ফুটবল ছিল ছন্দময়, দ্রুতগতির ও নির্মম। অন্যদিকে গুস্তাভো আলফারোর প্যারাগুয়ে। তারা সৌন্দর্যের চেয়ে বিশ্বাস করে শৃঙ্খলা, ধৈর্য আর সুযোগের অপেক্ষায়। শেষ বত্রিশে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিদায় করে ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি উপহার দিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।
এই লড়াইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের স্মৃতিও। সেবারও শেষ ষোলোর মঞ্চে দেখা হয়েছিল দুই দলের। প্যারাগুয়ের জমাট রক্ষণ ভাঙতে ফ্রান্সকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ম্যাচের ১১৪ মিনিট পর্যন্ত। লঁরা ব্লাঁর গোল্ডেন গোলেই শেষ পর্যন্ত জিতেছিল স্বাগতিকেরা। প্রায় তিন দশক পর আবার নকআউটে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে, নাকি ফিরে আসবে পুরোনো গল্প—সেই উত্তর মিলবে ফিলাডেলফিয়ায়।
প্যারাগুয়ের আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় কারণ জার্মানির বিপক্ষে জয়। হুলিও এনসিসোর গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর পুরো দল রক্ষণে যে শৃঙ্খলা দেখিয়েছে, সেটিই ম্যাচটিকে নিয়ে যায় টাইব্রেকারে। সেখানে গোলরক্ষক অরলান্দো গিল হয়ে ওঠেন নায়ক। সেই জয় এখন আলফারোর দলের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে।
ফ্রান্স এখন পর্যন্ত প্রায় নিখুঁত। গ্রুপপর্বে ইরাক ও নরওয়েকে সহজেই হারানোর পর শেষ বত্রিশে সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে দেশমের দল। আক্রমণ, মাঝমাঠ ও রক্ষণ—তিন বিভাগেই ভারসাম্য রেখে খেলছে তারা। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, ব্র্যাডলি বারকোলা ও মাইকেল ওলিসেকে নিয়ে আক্রমণভাগ এখনো বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর। এমবাপ্পে তো উড়ছেন। বিশেষ করে ওলিসে ইতিমধ্যে পাঁচটি অ্যাসিস্ট করে দারুণ ছন্দে আছেন।
ম্যাচের কৌশলও হতে পারে দারুণ আকর্ষণীয়। ফ্রান্স চাইবে দুই উইং ব্যবহার করে প্যারাগুয়ের রক্ষণ ছড়িয়ে দিতে। প্যারাগুয়ের জন্য বড় স্বস্তি, নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরছেন দিয়েগো গোমেস। আন্দ্রেস কুবাসের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি মাঝমাঠে শক্তি বাড়াবে। রক্ষণে অধিনায়ক গুস্তাভো গোমেজের নেতৃত্বই হবে এমবাপ্পেদের ঠেকাতে আলফারোর মূল পরিকল্পনা থাকবে নিচু রক্ষণভাগ গড়ে ফরাসিদের মাঝমাঠের ছন্দ নষ্ট করা এবং বল পেলেই এনসিসো ও মিগুয়েল আলমিরনকে নিয়ে দ্রুত প্রতি-আক্রমণে ওঠা।
পরিসংখ্যান ফ্রান্সের পক্ষে। শেষ ১৭ আন্তর্জাতিক ম্যাচের ১৬টিতেই তারা অন্তত দুই গোল করেছে। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পরিসংখ্যানের চেয়ে মানসিক দৃঢ়তা অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জার্মানিকে হারিয়ে প্যারাগুয়ে সেই বার্তাই দিয়েছে।
ফিলাডেলফিয়ায় তাই শুধু শেষ আটের একটি টিকিটের লড়াই নয়, এটি ফেবারিটের শক্তি আর আন্ডারডগের সাহসেরও পরীক্ষা। এক পাশে এমবাপ্পেদের তারকাখচিত ফ্রান্স, অন্য পাশে অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্নে বিভোর প্যারাগুয়ে। শেষ পর্যন্ত হাসবে কারা, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।