সাংহাইয়ের একটি স্পোর্টস বারে তখন উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ। বিশাল পর্দায় প্রদর্শিত খেলায় জাপানের আক্রমণ। মুহূর্তের মধ্যেই আয়াসে উয়েদার হেডে বল জড়িয়ে গেল জালে। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জাপানের চতুর্থ গোল। সঙ্গে সঙ্গে নীল জার্সি পরা সমর্থকদের চিৎকারে কেঁপে ওঠে বারটি।
দৃশ্যটা হয়তো খুব স্বাভাবিক। বিশ্বকাপের সময় এমন উন্মাদনা তো প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। অস্বাভাবিকতা অন্য জায়গায়—এই সমর্থকেরা জাপানি নন, তাঁরা চীনা।
ইতিহাস, রাজনীতি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে চীন-জাপান সম্পর্ক কখনোই খুব সহজ ছিল না। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের স্মৃতি, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয়। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো এমন এক জায়গা তৈরি করে, যেখানে পাসপোর্ট, সীমান্ত কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
সাংহাইয়ের সেই সমর্থকগোষ্ঠীর অন্যতম সংগঠক ফ্যান বলছিলেন, তাঁদের জাপান-প্রেম রাজনীতি থেকে আসেনি। এসেছে শৈশব থেকে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের প্রজন্মের অনেকেই জাপানি অ্যানিমে দেখে বড় হয়েছি। বিশেষ করে “ক্যাপ্টেন সুবাসা”। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার শুরুটা সেখান থেকেই।’
কিন্তু শুধু অ্যানিমে নয়, আরেকটি কারণও আছে। ফ্যানের মতে, জাপান এখন এশিয়ান ফুটবলের গর্বের প্রতীক। বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন কোনো এশিয়ান দল বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সমানে লড়াই করে, তখন অনেক চীনা সমর্থকও নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পায় সেখানে।
বাস্তবতাও হয়তো সেই অনুভূতিকে উসকে দেয়। চীনের ফুটবল এখনো পথ খুঁজছে। দেশটি মাত্র একবার বিশ্বকাপে খেলেছে, ২০০২ সালে। তিন ম্যাচেই হেরেছিল, গোলও করতে পারেনি। অন্যদিকে জাপান এখন নিয়মিত বিশ্বকাপ খেলছে, ইউরোপের বড় লিগগুলোতে খেলোয়াড় পাঠাচ্ছে, আর বিশ্বসেরাদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে।
জাপান নিয়ে বই লেখা চীনা লেখক ফু জিনইউর মতে, জাপানের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী যুব উন্নয়নব্যবস্থা এবং সুসংগঠিত ফুটবল সংস্কৃতি। তাঁর ভাষায়, জাপান এখন ইউরোপীয় মানের প্রতিযোগিতামূলক দল।
তবে এই সমর্থনের পথ সব সময় সহজ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাপানকে সমর্থন করার কারণে অনেক চীনা ভক্তকে সমালোচনা, বিদ্রূপ এমনকি অপমানও সহ্য করতে হয়। কেউ কেউ তাঁদের ‘দেশদ্রোহী’ বলেও আখ্যা দেন।
পূর্ব চীনের ৩০ বছর বয়সী আকি ইয়াং জাপান জাতীয় দল নিয়ে একটি ফ্যান পেজ পরিচালনা করেন। অনুসারী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে কটূক্তিও। তবু তিনি থামেননি। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ফুটবল মানুষের মধ্যে দেয়াল ভাঙতে পারে। একই কারণে নিজের সমর্থন প্রকাশ করতেও দ্বিধা করেন না ফ্যান, ‘আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের একটি সেতু তৈরি করা।’
হয়তো কথাটা শুনতে আদর্শবাদী মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, ফুটবল বহুবার এমন কাজ করেছে, যা রাজনীতি পারেনি। স্টেডিয়ামে অপরিচিত মানুষকে বন্ধু বানিয়েছে, প্রতিপক্ষ দেশের পতাকাকে সম্মান করতে শিখিয়েছে, শত্রুতা ভুলে একসঙ্গে উল্লাস করার সুযোগ দিয়েছে।
জাপানের জয়ে সাংহাইয়ের সেই উচ্ছ্বসিত বিকেল তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের গল্প নয়। এটি এমন এক পৃথিবীর গল্প, যেখানে মানুষ কখনো কখনো জাতীয়তা নয়, আনন্দকে বেছে নেয়।