নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে যোগ করা হলো আরও ৫ মিনিট।দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস তখন হয়তো মনে মনে অতিরিক্ত সময়ের কৌশল সাজাচ্ছিলেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্যালারিতে থাকা হাজারো দর্শকও মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আরও ৩০ মিনিটের স্নায়ুচাপের জন্য। কিন্তু ফুটবল বিধাতার মনে তখন অন্য এক নাটকীয় চিত্রনাট্য। নকআউট ম্যাচ বলে কথা।
ঘড়িতে তখন ৯২ মিনিট। ডান প্রান্ত থেকে ভেসে আসা একটি ক্রস দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডার হেডে ক্লিয়ার করলেও তা পুরোপুরি বিপদমুক্ত করতে পারেনি। বক্সের ঠিক বাইরে, একদম মাঝবরাবর বলটা এসে পড়ল স্টিফেন ইউস্তাকিওর পায়ে। ঠান্ডা মাথায় বলটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডান পায়ের এক মাপা শটে বল পাঠিয়ে দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জালে। উইলিয়ামস সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বলের নাগাল পেলেন না। স্তব্ধ হয়ে গেল দক্ষিণ আফ্রিকার ডাগআউট, আর উল্লাসের সুনামি বয়ে গেল কানাডা শিবিরে। ইউস্তাকিওর এই শটেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করল জেসি মার্শের কানাডা।
অথচ ম্যাচের প্রথমার্ধের গল্পটা হতে পারত সম্পূর্ণ অন্যরকম। শুরু থেকেই আক্রমণের পসরা সাজিয়ে বসা কানাডা প্রথমার্ধেই লিড নিতে পারত। ২২ মিনিটে ডেরেক কর্নিলিয়াস একদম ফাঁকায় বল পেয়েও যে হেডটি করলেন, তা সোজা চলে গেল দক্ষিণ আফ্রিকান গোলরক্ষকের গ্লাভসে। ৪৪ মিনিটে বোম্বিটোর জোরালো হেড যখন নিশ্চিত গোলের দিকে যাচ্ছিল, তখন গোললাইন থেকে বাঁচান দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডার মোদিবা। এর ঠিক পরেই ম্যাচে ছড়ায় তীব্র উত্তেজনা। বক্সের ভেতর কানাডার রিচি লারিয়াকে পেছন থেকে ফাউল করে বসেন দক্ষিণ আফ্রিকার মুদাও। আপাতদৃষ্টিতে এটি স্পষ্ট পেনাল্টি মনে হলেও রেফারি বাঁশি বাজাননি, এমনকি ভিএআরও রেফারিকে মাঠের মনিটর দেখার প্রয়োজন মনে করেনি।
দ্বিতীয়ার্ধেও লড়াই চলল সমানে সমানে। ৬৪ মিনিটে ওলুয়াসেয়ির এক দুর্দান্ত কাউন্টার-অ্যাটাক থেকে প্রায় গোল পেয়েই যাচ্ছিল কানাডা, কিন্তু এবারও দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্ডার মবোকাজি গোললাইনের ওপর থেকে বল ক্লিয়ার করে নিজের জাল অক্ষত রাখেন। ম্যাচ যখন আস্তে আস্তে গতি হারাচ্ছিল এবং গ্যালারির দর্শকরা কিছুটা অধৈর্য হয়ে মেক্সিকান ওয়েভ তুলতে শুরু করেছিলেন, ঠিক তখনই আসল চালটি চালেন কানাডার কোচ জেসি মার্শ।
৭৫ মিনিটে মাঠে নামানো হলো কানাডার ফুটবলের পোস্টার বয় আলফনসো ডেভিসকে। তিনি মাঠে পা রাখতেই পুরো দলের চেহারা বদলে গেল। ডেভিসের গতি আর নিখুঁত পাসিংয়ের সামনে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগ খেই হারিয়ে ফেলে।
৭৮ মিনিটে ডেভিসের তৈরি করা এক সুযোগ থেকে জোনাথন ডেভিডের জোরালো শট কোনোমতে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন উইলিয়ামস। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে শাফেলবার্গের ক্রস থেকে আসা বলে ইউস্তাকিওর সেই জাদুকরী শট কানাডার ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় এক অধ্যায় লিখে দিল, আর দক্ষিণ আফ্রিকাকে ডোবাল হতাশায়। তবে ফুটবলপ্রেমী হিসেবে বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের শুরুটা এমনই আশা করেছিলেন আপনি!