নেইমার কাঁদছেন, অঝোরে কাঁদছেন। তাঁর সঙ্গে রিও ডি জেনিরো, সা পাওলোসহ পুরো ব্রাজিলই কি নয়? কাঁদছে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা ব্রাজিল সমর্থকেরা। বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে এভাবে বিদায়। শেষ ষোলো থেকে ব্রাজিল সর্বশেষ কবে বিদায় নিয়েছে? ১৯৯০ বিশ্বকাপ, সেই ৩৬ বছর আগে।
ফুটবল পৃথিবী এ কোন ব্রাজিলকে দেখছে! সেই ব্রাজিলের কথা মনে আছে? যে দল বল নিজেদের দখলে রাখতে ভালোবাসত। যাদের ফুটবলের ভিত্তিই ছিল নিখুঁত পাসিং, সৃজনশীল সমন্বয় আর কল্পনাকেও ছাপিয়ে যাওয়া দৃষ্টিনন্দন আক্রমণ। যাদের কাছে ‘জোগো বোনিতো’ বা ‘সুন্দর ফুটবল’ ছিল একপ্রকার ধর্ম। সাম্বার তালে ব্রাজিল তাদের জয়ের সূত্র হারিয়েছে। আর এটা আজ নতুন নয়—অনেক দিন ধরে চলে আসা ব্যর্থতার মিছিলের আরেকটা সংস্করণই দেখল ২০২৬ বিশ্বকাপ।
ব্রাজিলের সর্বশেষ কোন বড় শিরোপা সেই নান্দনিক, সুপরিকল্পিত ফুটবল খেলে জেতা, বলুন তো? ব্রাজিলের যে ফুটবল আজ কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে, সেটি আসলে অন্য এক সময়ের। তাদের এ সময়ের ফুটবল যেন সেই ব্রাজিলকে গ্রাস করেছে। আজকের সেলেসাও সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সূত্রে খেলে, তাতে জেতে, আবার হারেও।
এমনভাবে হারে, তাতে ব্রাজিল সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। নিউজার্সিতে নরওয়ের কাছে হারের পর তা-ই হচ্ছে।
কেউ কি কল্পনা করেছিল, বল দখলের লড়াইয়ে নরওয়ে ব্রাজিলকে দ্বিগুণ ব্যবধানে ছাপিয়ে যাবে? কিংবা নরওয়েজিয়ানরা একের পর এক পাস খেলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়েও আরও গোলের খোঁজে ঝাঁপাবে? আর আর্লিং হালান্ড শুধুই শক্তির প্রতীক নন, সেটিও তিনিও এভাবে জানান দেবেন! নিউজার্সিতে ২-১ ব্যবধানে নরওয়েজিয়ানদের এই জয় ব্রাজিলকে প্রত্যাশার অনেক আগেই রিও ডি জেনেইরোর বিমানে তুলে দিল। হালান্ড যেন তাঁর হৃদয়কাঁপানো হাসিতে ভিনিদের বলতে চাইলেন, বিদায়, বন্ধু বিদায়!
ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তির হাত ধরে হেক্সা মিশনে নেমেছিল ব্রাজিল। তাঁর ক্ষুরধার ফুটবল মস্তিষ্ক নেইমারের মতো খেলোয়াড়কে কতটা ঠিকঠাক ব্যবহার করেছেন, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে গেছে। আনচেলত্তি এমন এক কৌশল বেছে নিয়েছিলেন, যার মূল শক্তি ছিল দ্রুতগতির লং বলের আক্রমণ। আর সেই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র রিয়াল মাদ্রিদের শিষ্য ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। প্রতিপক্ষকে অপেক্ষায় রেখে মুহূর্তেই প্রচণ্ড গতিতে আঘাত হানাই ছিল ব্রাজিলের পরিকল্পনা।
ব্রাজিলের পরিকল্পনা নরওয়ের কাছে অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নরওয়েজিয়ানরা যে পরিকল্পনায় নেমেছিল, সেটা হয়তো কিছুটা অজানাই ছিল ব্রাজিলের। মার্টিন ওডেগার্ড ও প্যাট্রিক বার্গ মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে নিয় নেন। দুই প্রান্তে আন্তোনিও নুসা ও আলেক্সান্দার সোরলোথ বারবার রক্ষণভাগ ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, আর হালান্ড তখন পর্যন্ত শুধু এক সম্ভাব্য হুমকি—প্রথম আধঘণ্টায় ম্যান সিটি স্ট্রাইকার বলই ছুঁতে পারেননি প্রায়।
নরওয়ের রক্ষণ এতটাই ছড়িয়ে ছিল যে প্রথম ভুলের সুযোগেই আঘাত হানে ব্রাজিল। ১২ মিনিটে মাতিয়াস কুনিয়া গতি বাড়াতেই তাঁকে ফাউল করেন ডেভিড উলফে। রেফারি ছাড়া নিউজার্সি স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৭০ হাজার দর্শকই বোধহয় দেখেছিলেন, এটা নিশ্চিত পেনাল্টি। শেষ পর্যন্ত ভিএআরের সহায়তায় নিশ্চিত হন রেফারি। আর তাতেই যেন ম্যাচটা ঘুরে যাওয়া শুরু, অন্যতম নায়ক বনে যান নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড। পরিসংখ্যান বলে, নেইমার ছাড়া শট নেওয়ার আগে থেমে থেমে দৌড়ানো খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্রাজিলের পেনাল্টি মিস করার সম্ভাবনাই যেন বেশি। ব্রুনো গিমারেসও তার ব্যতিক্রম হতে পারলেন না।
এই মুহূর্ত নরওয়েকে আরও উজ্জীবিত করে তোলে। তারা আর শুধু লড়াই করেনি, মাঝমাঠে দুর্দান্ত শক্তিতে ছুটতে শুরু করে। ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসনকে একের পর এক পরীক্ষা দিতে হয় তাতে। মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের রক্ষণে যে দুর্বলতা দেখা গিয়েছিল, নরওয়ের বিপক্ষেও তার পুনরাবৃত্তি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দুই দলই কয়েকটি পরিবর্তন আনে। ভিনিসিয়ুস দারুণ এক আক্রমণ গড়ে এন্দ্রিককে একা পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন, কিন্তু শট লক্ষ্যভ্রষ্ট।
৬৭ মিনিটে নেইমারকে নামান আনচেলত্তি। তাঁর মাঠে নামা যেন নতুন করে সৃজনশীলতা আর ছন্দ ফেরানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতিই থেকে গেছে। নরওয়েজিয়ানদের কোনো ভয় ছিল না। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের জার্সির প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা-ভয় দেখায়নি তারা। একই ছন্দে খেলতে থাকে, বিশেষ করে নিষ্প্রভ দানিলোর দিকটাকেই বারবার নিশানা বানায়। অবশেষে আসে সেই ক্রস, আর সেটিকে কাজে লাগিয়ে হালান্ড যেন এক ধাক্কায় পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, রোনালদো, দুঙ্গা, রোনালদিনহোদের উত্তরাধিকারকেই মাটিতে ফেলে দিলেন। ৭৯ মিনিটে হালান্ডের হেডটা যেন ভয়ংকর এক শেলের মতো বিঁধল ব্রাজিলিয়ানদের বুকে।
ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তনের আশা তখন শুধু ভিনিসিয়ুসের পায়ে। তিনি চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি। ভাগ্যও ব্রাজিলের পাশে দাঁড়ায়নি। নরওয়ের গোলকিপার নাইল্যান্ড শুধু প্রতিপক্ষের শটই নয়, প্রয়োজনে নিজের সতীর্থদের ভুলও ঠিক করে দিচ্ছিলেন। নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের মানসিকতা। তারা রক্ষণে গুটিয়ে যায়নি, বরং বল দখলে রেখে পাসের পর পাস খেলেছে। কী নির্মম পরিহাস, এটাই তো একসময় ছিল ব্রাজিলের পরিচয়।
এত বল দখলের মধ্যেও শক্তির প্রতীক হালান্ড দেখিয়ে দিলেন, তিনি শুধু হেডে গোল করতেই জানেন না। সঠিক সময়ে কী করতে হয়, সেটাও জানেন। ৯০ মিনিটে ঠান্ডা মাথায় বাঁ পায়ের দুর্দান্ত নিচু শটে ঘণ্টায় প্রায় ঝড়ের গতিতে বল জালে পাঠিয়ে তিনি শেষ নকআউট ঘুষিটাও যেন মেরে দেন ব্রাজিলের মুখে।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নেইমারের পেনাল্টি গোল শুধুই তাঁর ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে নতুন সংখ্যা যোগ করেছে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে নরওয়ে। আর নিজেদের ফুটবল-ডিএনএ বদলে ফেলার মূল্য ব্রাজিলকে দিতে হয়েছে সবচেয়ে বড় মঞ্চেই, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়ে।
২০০২ বিশ্বকাপ জেতার পর ২৪ বছর পেরিয়ে গেছে, ব্রাজিলের পূরণ আর হলো না তাদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্ন। বুকের পাঁচটা তারা যেন তাদের বাপ-দাদার রেখে যাওয়া সেই বিপুল সম্পত্তি, যেটির নাম ভাঙিয়ে তারা চলেছে দুই যুগ। এ অপেক্ষার শেষ কবে, তা জানেন না কোনো ব্রাজিলিয়ানই।