হোম > খেলা > ফুটবল

জবাবটা দিতে হবে মেসিদেরই

রানা আব্বাস, কানসাস থেকে

অনুশীলনে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। ছবি: সংগৃহীত

লিওনেল মেসি একটু দেরিতে বের হলেন ড্রেসিংরুম থেকে। কানসাস সিটির স্পোর্টিং কেসি ট্রেনিং সেন্টারে আর্জেন্টিনার অনুশীলন দেখার সুযোগই মাত্র ১৫ মিনিট। ১০-১২ মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পর ধীরপায়ে কজন সতীর্থের সঙ্গে বের হলেন তিনি। বেরিয়ে মাঠেও গেলেন না, গা এলিয়ে বসলেন বেঞ্চে।

‘বস এসেছেন, তাঁকে চা বানিয়ে খাওয়াতে হবে’—এমন এক দৃশ্যের অবতারণা এ সময়ে। বেঞ্চে এক সতীর্থ ফ্লাক্স থেকে গরম পানি ঢাললেন। তৈরি হলো আর্জেন্টিনার বিখ্যাত চা ‘মাতে’—মেসিসহ বেশির ভাগ আর্জেন্টাইন ফুটবলারের প্রিয় পানীয়। মেসির মাতে খাওয়ার দৃশ্য আর দেখা হলো না। তার আগেই বিদায়ের বাঁশি বাজিয়ে দিল আর্জেন্টিনা টিম ম্যানেজমেন্ট। ১৫ মিনিট শেষ। এ সময়ে একটু বল নিয়েও কারিকুরি করলেন না মেসি। আর্জেন্টিনা অধিনায়কের ২-৩ মিনিট বসে থাকার দৃশ্য দেখেই ফিরতে হলো। তবে এই ক্ষণিকের দেখায় একটা বিষয় পরিষ্কার, মিসরের বিপক্ষে উত্তেজনাময়, শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের পর মেসিকে অনেক শান্ত, নীরব মনে হলো। অনেকটা বড় ঝড়ের পর যেভাবে সবকিছু ঠান্ডা হয়ে আসে।

চারদিকে তাঁর ও তাঁদের দল নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে, মেসি কি তা নিয়ে আদৌ চিন্তিত? মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের রেফারিং নিয়ে যত তর্ক-বিতর্ক হোক, মেসিদের মতো খেলোয়াড়দের এসব নিয়ে ভাবলে কি আর চলে? তাঁদের লক্ষ্য, স্বপ্ন অনেক বড়। বড় স্বপ্ন পূরণে মাঠের বাইরের কথায় কান দিলেই বিপদ! তবে মেসিকে যে অনেক কিছুর জবাব দিতে হবে, এটা নিশ্চয়ই তিনি নিজেও ভাবছেন।

মেসির প্রথম ধাঁধা, পেনাল্টি কেন মিস করেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ফুটবলে প্রায় সব অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। কিন্তু একটি দক্ষতা আছে, যেখানে এই ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার জাদুকরও যেন অন্য সবার চেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। পেনাল্টি নিতে যখন মেসি বলের সামনে দাঁড়ান, তখন গোললাইন থেকে তাঁর দূরত্ব মাত্র ১২ গজ। সামনে থাকে প্রায় ১৯৬ বর্গফুটের বিশাল গোলমুখ, আর প্রতিপক্ষ হিসেবে শুধু একজন গোলরক্ষক। তবু আশ্চর্য, এটাই সেই মুহূর্ত, যখন তাঁর অতিমানবীয় ক্ষমতাগুলো যেন হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়!

মঙ্গলবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়েও মেসি আরেকটি পেনাল্টি মিস করেন। এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে তাঁর দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে আটটি পেনাল্টি নেওয়ার মধ্যে চতুর্থবারের মতো লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে (টাইব্রেকার বাদ দিয়ে) মেসি ১৪৮টি পেনাল্টির মধ্যে সফল হয়েছেন ১১৪টিতে। তাঁর সাফল্যের হার ৭৭ শতাংশ। পেনাল্টি-স্পটই একমাত্র জায়গা, যেখানে ভিনগ্রহের প্রতিভাধর বলে মনে হওয়া মেসি হঠাৎ করেই খুব সাধারণ একজন ফুটবলারের মতো হয়ে পড়েন। তা-ই নয়, বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে আর কোনো খেলোয়াড় মেসির চেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস করেননি।

সম্ভবত এ কারণেই মঙ্গলবারের সেই নতুন ব্যর্থতার পর মেসির প্রতিক্রিয়া ছিল এতটা আবেগঘন, যা অতিমানবীয় বলে বিবেচিত কোনো ক্রীড়াবিদের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা যায়। শেষ বাঁশি বাজার পর তিনি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি; অঝোরে কেঁদেছেন। নকআউটের বাকি যাত্রায় একাধিকবার আসতে পারে পেনাল্টির সুযোগ। মেসিকে এই ধাঁধার উত্তর মেলাতেই হবে।

মিসরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের পর একটি বিষয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, শুধু টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্নই নয়, মেসির বিশ্বকাপ-যাত্রাকে যত দূর সম্ভব দীর্ঘায়িত করাও তাঁর সতীর্থদের বড় লক্ষ্য। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমকে লিয়ান্দ্রো পারেদেস যেমন বলেছেন, মেসির জন্য সবাই, সবার জন্য মেসি। দলের ভেতরে নীরবে উচ্চারিত এক অলিখিত শপথ—সবাই চায়, মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায় যতটা সম্ভব দীর্ঘ হোক।

আর্জেন্টিনা যেন মাঠে একজন অতিরিক্ত খেলোয়াড় নিয়ে নামে। সেই অতিরিক্ত শক্তির নাম ‘মেসিম্যানিয়া’। যে উন্মাদনা সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায়, একই অনুভূতি কাজ করে দলের প্রত্যেকের মধ্যেও। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সবাই নিজেদের শতভাগেরও বেশি উজাড় করে দিয়েছিল, তাঁরা চেয়েছিল মেসি যেন অবশেষে নিজের বিশ্বকাপ জেতেন। চার বছর পরও সেই মানসিকতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। লুসাইলে বিশ্বকাপজয়ী ১৭ জন ফুটবলার এই দলেও আছেন, নতুনেরাও একই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ। তাঁদের একটাই লক্ষ্য—সময়কে হারিয়ে দেওয়া; যেন ১০ নম্বর জার্সি পরা সুপারহিরো আরও কিছুদিন বিশ্বকাপের আকাশে উড়ে বেড়াতে পারেন।

সতীর্থরা মেসিতে উজ্জীবিত থাকেন সব সময়। মেসি নিজেও অনুপ্রেরণা পান সতীর্থদের নিখাদ ভালোবাসায়। শেষ আটের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার সামনে এবার সুইজারল্যান্ড। কানসাসে শনিবারের (বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল ৭টায়) সেই লড়াইয়ে আরেকটি ধাপ পেরোতে পারলেই সেমিফাইনাল, এরপর ১৯ জুলাইয়ের ফাইনাল। আর্জেন্টিনা অত দূরে এখনই তাকাতে চায় না। এগোতে চায় ধাপে ধাপে।

নকআউট পর্বটাই ‘বাঁচো অথবা মরো’, স্বাভাবিকভাবে এ পর্বের ম্যাচগুলোয় থাকে উত্তেজনা, স্নায়ুক্ষয়ী ও বিতর্কিত অনেক মুহূর্ত। মেসিরা তাই হয়তো নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না বিতর্কমুক্ত দুর্দান্ত এক ম্যাচ উপহার দেওয়ার। তবে উত্তেজনাময়, শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তের মধ্যেও সুন্দর ফুটবল উপহার তাঁরা দিতেই পারেন।

সমান গোলের পরও গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে মেসির ওপরে এমবাপ্পে

এমবাপ্পে-দেম্বেলের গোলে মরক্কোকে আবারও কাঁদিয়ে সেমিতে ফ্রান্স

নিখুঁত স্পেনের সামনে অভিজ্ঞ বেলজিয়াম

শৈশবের বইঠায় বিশ্বকাপে হালান্ডদের জয়গান

‘মেসি-নেইমার-রোনালদোরাই আমাদের শৈশবের অনুপ্রেরণা’

‘ব্রাজিলের বিপক্ষেও নরওয়ে ছিল আন্ডারডগ, দেখি এবার কী হয়’

মেসিকে ‘মাতে’ খাওয়াচ্ছেন সতীর্থরা

আর্জেন্টিনা ম্যাচ হারের পর মিসর কোচের সুখবর

বারবার কাঠগড়ায় ফিফার রেফারিং

‘ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই’