হঠাৎই এক নোটিফিকেশন আসতে শুরু করল। প্রথমে দু-একটা, তারপর আরও। ফ্লোরিডার সারাসোটায় নিউজিল্যান্ড দলের সঙ্গে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত টিম পেইন ইনস্টাগ্রাম খুললেন। দেখলেন, কেউ একজন তাঁকে একটা ভিডিওতে ট্যাগ করেছেন। ভিডিওটা স্প্যানিশে। পেইনের স্প্যানিশ জানা নেই। তাই ফোনটা এগিয়ে দিলেন স্ত্রীর হাতে।
স্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন বিষয়টা। আর্জেন্টিনার কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভালেন স্কার্সিনি, ইনস্টাগ্রামে যিনি ‘এল স্কার্সো’ নামে পরিচিত; বিশ্বকাপের সব দলের প্রত্যেক খেলোয়াড় ঘেঁটে খুঁজে বের করেছেন সবচেয়ে কম পরিচিত মানুষটিকে। গ্রুপ ‘জি’তে নিউজিল্যান্ডের হয়ে খেলবেন এমন একজন ডিফেন্ডার, ওয়েলিংটন ফিনিক্সের রাইটব্যাক, যাঁর ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ার পাঁচ হাজারও নেই। তিনি টিমোথি জন পেইন। বয়স বত্রিশ। জন্ম অকল্যান্ডে।
স্কার্সিনি তাঁর ভিডিওতে বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এমন একজন খেলোয়াড় থাকতেন, যাকে আমরা সবাই দেশ-জাতি-নির্বিশেষে একসঙ্গে সমর্থন দিতে পারতাম?’
স্কার্সিনির এই কাজটা নতুন নয়। কিছুদিন আগে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন লিখটেনস্টাইনের পঞ্চম বিভাগের ক্লাব এফসি বালৎসারকে—যাদের ক্রিসমাসের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে মাত্র ১৫টি লাইক পড়েছিল। স্কার্সিনি সেই দলকে দেখিয়ে দিলেন তাঁর ফলোয়ারদের। কয়েক দিনের মধ্যে বালৎসারের ফলোয়ার হয়ে গেল ৪ লাখ ৪০ হাজার। ইন্টারনেটের একটা আজব বৈশিষ্ট্য আছে—সে দুর্বলের পক্ষ নেয়, অজানার পাশে দাঁড়ায়।
এবার পেইনের পালা। স্কার্সিনি তাঁর ফলোয়ারদের বললেন পেইনের পোস্টে লাইক-কমেন্ট-ফলো দিয়ে ভাসিয়ে দিতে। বিশ্বকাপের স্টিকার অ্যালবামে পেইনের স্টিকার থাকলে ছবি তুলে পোস্ট করতে। লক্ষ্য একটাই—বিশ্বকাপ শুরুর আগে যত বেশি সম্ভব মানুষ যেন টিম পেইনকে চেনে।
আর তারপর স্প্যানিশ ভাষায় একটা গানও তৈরি হয়ে গেল—যার কোরাসের বাংলা মোটামুটি এ রকম—‘আমি তার পাশে আছি, আমি তাকে সাহস দিচ্ছি, শুরু থেকেই তার জন্য গলা ছেড়েছি আমি। টিম পেইন—কবর পর্যন্ত তোমার সঙ্গে। নো পেইন, নো গেইন।’
পেইন যখন পরদিন সকালে উঠলেন, তখন সংখ্যাগুলো অবিশ্বাস্য হয়ে গেছে। প্রতি মিনিটে প্রায় এক হাজার করে ফলোয়ার বাড়ছে। সেই সংখ্যা পেরিয়ে গেল নিউজিল্যান্ড জাতীয় দলের মোট ফলোয়ার সংখ্যা। পেরিয়ে গেল তাঁর ক্লাব ওয়েলিংটন ফিনিক্সকে। পেরিয়ে গেল এ-লিগের সব দল মিলিয়ে যত ফলোয়ার, তারচেয়ে বেশি। এমনকি পেরিয়ে গেল স্কার্সিনি নিজেকেও। দেড় মিলিয়নের কাছে পৌঁছে থামল সংখ্যাটা।
নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক নটিংহ্যাম ফরেস্টের ফরোয়ার্ড ক্রিস উডের চেয়ে ছয় গুণ বেশি ফলোয়ার এখন পেইনের। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বেশি। তিনি বলেন, ‘এই সপ্তাহখানেক আগেও আমি চুপচাপ ক্যাম্পে এসেছিলাম, বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। আর এখন বহু দেশের লাখ লাখ মানুষ আমার ইনস্টাগ্রাম ফলো করছেন।’
নিউজিল্যান্ড ফেডারেশনের তোলা একটি ভিডিওতে পেইন স্বীকার করলেন যে, তিনি মোটেও সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ নন, যেটা এত দিন তাঁর ফলোয়ার সংখ্যাই প্রমাণ করত। তিনি বললেন, ‘মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি, একটু হাসার চেষ্টা করছি।’ স্কার্সিনিকে সরাসরি বার্তাও পাঠালেন, ‘ভাবছিলাম কেন এত নোটিফিকেশন আসছে, তারপর তোমার পোস্টটা দেখলাম।’
পুরো ব্যাপারটায় একটা আশ্চর্য উষ্ণতা আছে। কোনো অ্যাজেন্ডা নেই, কোনো স্পনসর নেই, ইন্টারনেটের একটা কোণ শুধু ঠিক করল যে—এই মানুষটাকে তারা চেনে, এই মানুষটার পক্ষে তারা আছে।
তবে পেইন এরপর যা বললেন, সেটাই আসল কথা। ভাইরাল হওয়ার গল্পটা পেছনে ফেলে, ফলোয়ারের সংখ্যার বাইরে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে আমি চাই, আমরা দল হিসেবে, জাতি হিসেবে এই মানুষগুলোকে গর্বিত করতে পারি। তাদের উল্লাস করার কিছু একটা দিতে পারি।’