১১ জুন শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ । যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে খেলছে ৪৮ দল । ‘বিশ্বকাপের দল’ শীর্ষক এই ধারাবাহিকে কোন দল কেমন , সেটি তুলে ধরার প্রয়াস । আজকের পর্বে মিসর
আফ্রিকান ফুটবল মানচিত্রে সবচেয়ে উঁচু আসনটা এখনো মিসরেরই। পকেটে সাতটি মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট (আফকন), অথচ বিশ্বমঞ্চে দাঁড়ালেই যেন চেনা ছন্দ হারিয়ে ফেলে নীল নদের দেশের যোদ্ধারা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একটি জয়ের দেখা না পাওয়া পরিসংখ্যানটি কোনোভাবেই মিসরের ফুটবল ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই নয়। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে কায়রোর অলিতেগলিতে এখন নতুন করে আশার প্রদীপ জ্বলছে। এবার শুধু অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং নকআউটে নিজেদের নাম খোদাই করতে মরিয়া ফারাওরা।
২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়ার পথটা মিসরের জন্য ছিল দাপুটে। গত আসরে সেনেগালের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে খেলতে না পারলেও এবার তারা কোনো ভুল করেনি। বাছাইপর্বের ১০টি ম্যাচে ৮টি জয় এবং ২টি ড্র করে অপরাজিত থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। ৯১ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম তারা অপরাজিত থেকে বাছাইপর্ব শেষ করার কীর্তি গড়েছে। কোচ হোসাম হাসানের অধীনে দলটি এখন শুধু আক্রমণভাগেই নয়, বরং প্রতিপক্ষকে রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমান দক্ষ।
পুরো বাছাইপর্বে অভিযানে তারা গোল হজম করেছে মাত্র দুটি। রুই ভিতোরিয়ার রেখে যাওয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে হোসাম হাসান এক অজেয় দেয়াল তৈরি করেছেন। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যথারীতি সেই একজনই—মোহাম্মদ সালাহ। লিভারপুলের জার্সি গায়ে তাঁর ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলা চললেও, জাতীয় দলের লাল জার্সিতে তিনি আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বাছাইপর্বে ৯টি গোল করে একাই টেনে নিয়েছেন দলকে। তবে এবারের মিসর দলটি শুধু সালাহর ওপর এককভাবে নির্ভরশীল নয়। ম্যানচেস্টার সিটির ওমর মারমুশের সঙ্গে আছেন মোস্তফা মোহামেদ ও ট্রেজেগুয়ের মতো পরীক্ষিত পারফর্মাররা। তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার এই মিশেলই হোসাম হাসানের বড় শক্তির জায়গা।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে যোগ দেওয়ার পথে সামুদ্রিক ঝড় তাদের জাহাজ মিস করিয়েছিল। সেই যে ভাগ্যের বিড়ম্বনা শুরু, তা যেন পরবর্তী কয়েক দশক তাড়া করে ফিরেছে তাদের। ১৯৯০ বিশ্বকাপের দুই ড্র এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে সালাহর চোটমাখা দুঃস্মৃতি—মিসরীয়দের আক্ষেপ শুধুই বেড়েছে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘সি’তে পড়ে খানিকটা স্বস্তিতে আছে বলা যায়। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের ধার এখন আর আগের মতো নয়। ইরান ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের সামর্থ্য নেই বললে ভুল বলা হবে। আগামী ১৫ জুন সিয়াটলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই শুরু হবে তাদের অগ্নিপরীক্ষা।
সাম্প্রতিক প্রীতি ম্যাচে সৌদি আরবকে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা স্পেনের মতো পরাশক্তির সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করা প্রমাণ করে—এই মিসর হারতে শেখেনি। মোহাম্মদ সালাহ যদি তাঁর সেরা ছন্দে থাকেন এবং হোসাম হাসানের রক্ষণভাগ অটুট থাকে, তবে ২০২৬ হতে পারে ফারাওদের সেই কাঙ্ক্ষিত বসন্ত। গিজার পিরামিড ছাপিয়ে এবার বিশ্বজয়ের নেশায় মত্ত ফারাওরা। বিধাতা কি এবার তাদের দিকে ফিরে তাকাবেন? উত্তর মিলবে বিশ্বকাপের সবুজ গালিচায়।
খেলোয়াড়ি জীবনে মিসরের হয়ে খেলেছেন টানা ২১ বছর। ১৭৭ ম্যাচে ৬৯ গোল করে দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি। খেলোয়াড় হিসেবে যা পারেননি হোসাম হাসান, কোচ হিসেবে সেটাই এখন লক্ষ্য। ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দলের মধ্যে এক লড়াকু মানসিকতা তৈরি করেছেন। তাঁর হাত ধরেই ৯১ বছর পর বাছাইপর্বে অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়েছে ফারাওরা। হাসানের কৌশলী ফুটবল দর্শনে মিসরের রক্ষণভাগ এখন দুর্ভেদ্য। শেষ ১০ ম্যাচে মাত্র দুটি গোল হজম করেছে তারা।
লিভারপুলের ইতিহাসে নিজেকে কিংবদন্তিদের কাতারে নিয়ে যেতে ৯টি মৌসুম যথেষ্টর চেয়েও বেশি করেছেন মোহাম্মদ সালাহ। ২০১৯ চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়, দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এবং প্রিমিয়ার লিগে চারবার গোল্ডেন বুট—সব মিলিয়ে অ্যানফিল্ডে তাঁর সময়কাল ছিল ধারাবাহিকতার এক অনন্য প্রদর্শনী। ৩৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড মাঠ ও মাঠের বাইরে নেতার ভূমিকায় থেকে সামলাচ্ছেন আক্রমণভাগের মূল দায়িত্ব। বিশ্বকাপে মিসরীয় সমর্থকদের যাবতীয় প্রত্যাশার পারদ এখন তাঁকে ঘিরেই।
বিশ্বকাপে মিসরের ইতিহাস
র্যাঙ্কিং: ২৯
অংশগ্রহণ: ৪
সর্বোচ্চ সাফল্য: গ্রুপ পর্ব
ডাকনাম: ফারাও