সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে হার দিয়ে শেষ হয়েছে বাংলাদেশের এশিয়ান কাপ বাছাই। সহজেই বলা গেলেও এর ভেতর লুকিয়ে আছে হতাশা, আক্ষেপ, ভুলভ্রান্তি আর খানিকটা প্রাপ্তি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশ পারেনি মূল পর্বে টিকিট কাটতে। ৬ ম্যাচে ৫ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তিনে থেকে মিশন শেষ করেছেন হামজা-শমিতরা।
অথচ এক বছর আগে টুর্নামেন্টের শুরুতে প্রত্যাশার পারদ ছিল বেশ উঁচুতে। প্রিমিয়ার লিগ খেলা হামজা চৌধুরীর পাসপোর্টে যোগ হয় বাংলাদেশি জাতীয়তা। দ্রুত সময়ে জাতীয় দলে যোগ দেন শমিত সোম, ফাহমিদুল ইসলাম, জায়ান আহমেদ, কিউবা মিচেলের মতো প্রবাসী ফুটবলাররা। তাতে স্বপ্নের পরিধি বড় হতে থাকে। কিন্তু দিন শেষে বাংলাদেশের ভাগ্যটা আর বদলায়নি।
এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ছিল ভারতের বিপক্ষে মাঠের লড়াই। দুই লেগের কোনোটিতেই ভারতকে কোনো সুযোগ দেয়নি হাভিয়ের কাবরেরার দল। শিলংয়ের প্রথম দেখায় গোলশূন্য ড্র করে মূল্যবান ১ পয়েন্ট ছিনিয়ে আনার পর ঘরের মাঠে জাতীয় স্টেডিয়ামে শেখ মোরছালিনের একমাত্র গোলে ঐতিহাসিক জয় পায় বাংলাদেশ। সেটিও ২২ বছর পর। আরেকটু স্বস্তি হলো বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট শেষ করেছে ভারতের ওপরে থেকেই।
দুই দিন আগে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ভালোই খেলেছেন হামজা-শমিতরা। শুধু গোলের দেখাই পাননি। হংকংয়ের বিপক্ষে হংকংয়ের মাটিতেও তুলে ধরে লড়াকু ফুটবল। ঘরের মাঠে জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েও হারতে হয়েছে শেষের ভুলে। প্রাপ্তির উল্টো পিঠে তাই অপ্রাপ্তির বড় কাটা হয়ে বিঁধছে হংকংয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠের ম্যাচটি।
এই ৬ ম্যাচে খেলোয়াড়দের মানসিকতায় উন্নতি দেখছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গোলাম সরওয়ার টিপু। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘ভুলভ্রান্তি তো থাকবেই। তবে এখন সেগুলো কমিয়ে আনা হয়েছে এবং ছোটখাটো ভুল করার প্রবণতাও আগের চেয়ে অনেক কমেছে। খেলোয়াড়দের মানসিকতা এখন অনেক উন্নত। আগে প্রতিপক্ষ দেখলেই আমরা যেভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়তাম, এখন আর সেই ভয় নেই। এখন তারা জিততে আপ্রাণ চেষ্টা করে।’
বাংলাদেশের আক্রমণভাগে রাকিব হোসেন ও শেখ মোরছালিনের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। দলের ৬টি গোলের বেশির ভাগই এসেছে এই দুই তরুণের পা থেকে। তবে প্রাপ্তির খতিয়ানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল রক্ষণভাগের সমন্বয়হীনতা। ৬ ম্যাচে ৮ গোল হজম করা প্রমাণ করে যে বড় টুর্নামেন্টের চাপ সামলাতে রক্ষণভাগকে আরও পরিণত হতে হবে।
চার দলের মধ্যে মাঝমাঠের দিক থেকে অন্তত এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। হামজা–শমিত দুজনেরই আছে বিশ্বমানের লিগে খেলার অভিজ্ঞতা। গোলও করেছেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের দেওয়া বলগুলো ঠিকঠাকভাবে খুব কমই কাজে লাগাতে পেরেছেন বাকিরা।
জাতীয় দলের সাবেক স্ট্রাইকার শেখ মোহাম্মদ আসলাম বলেন, ‘রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে মাঝমাঠ পর্যন্ত খেলোয়াড়েরা বেশ ভালোই খেলেছে। কিন্তু আক্রমণভাগে দুই উইং এবং বিশেষ করে ৯ নম্বর জার্সিধারী মূল স্ট্রাইকারের অভাব আমি তীব্রভাবে অনুভব করছি। বাংলাদেশ অত্যন্ত চমৎকার খেলেছে। আমার মনে হয়েছে, সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে যেকোনো মুহূর্তেই তারা গোল পরিশোধ করতে পারত। দলের স্ট্রাইকিং জোনের সীমাবদ্ধতা বা দুর্বলতাগুলো বারবার প্রকট হয়ে উঠছে। আমাদের স্ট্রাইকিং জোনে গোল করার মতো সেই ধারালো আক্রমণ বা জোরালো প্রচেষ্টার অভাব রয়েছে। এই ঘাটতিটুকু না থাকলে আমাদের দল নিশ্চিতভাবেই জয়ী হয়ে ফিরতে পারত।’
বাংলাদেশের এমন ফুটবলে সিভি নিশ্চয়ই ভারী হবে কোচ হাভিয়ের কাবরেরার। তবে সমর্থকেরা তাঁকে কৃতিত্ব দিতে নারাজ। তাঁদের মতে, হামজা-শমিতরা না থাকলে মুখস্থ ফুটবল দিয়েই এমন একটি টুর্নামেন্ট কাটাতেন তিনি। এই মুখস্থ ফুটবল আর দেখতে চান না তাঁরা।
চুক্তি অনুযায়ী, সিঙ্গাপুর ম্যাচই ছিল কাবরেরার শেষ ম্যাচ। তবে বাংলাদেশের ডাগআউটে আরও সময় থাকার ইচ্ছা তিনি প্রকাশ করেছেন বরাবরই। তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি বাফুফে। আজকের পত্রিকাকে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘কোনো ইস্যু নিয়েই এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি।’
কাবরেরাকে নিয়ে আলোচনা এগোনো কি আর উচিত হবে—এখন বাংলাদেশ ফুটবলে এটাই বোধ হয় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।