মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা মানুষের অভিজ্ঞতাকে বলা হয়—‘নিয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্স’ বা ‘এনডিই’। দীর্ঘদিন ধরেই জীবন আর মৃত্যুর মাঝে থাকা এই ধূসর অবস্থাটি নিয়ে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের কৌতূহলের অন্ত নেই। কেউ কেউ দাবি করেন, ক্লিনিক্যালি মৃত অবস্থায়ও তারা এমন কিছু দেখেছেন বা শুনেছেন, যা স্বাভাবিকভাবে সম্ভব হওয়ার কথা নয়। এসব অভিজ্ঞতার কিছু ঘটনা এতটাই রহস্যময় যে, অনেক চিকিৎসক পর্যন্ত প্রশ্ন তুলেছেন—মানবচেতনা কি শুধু মস্তিষ্কের কার্যকলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি ‘আত্মা’ বলে সত্যিই কিছু আছে?
গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়া প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের এনডিই-এর অভিজ্ঞতার কথা জানান। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ বলেন, সেই মুহূর্তটিতে তারা স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি সচেতন অনুভব করেছিলেন। তবে সংশয়বাদীরা মনে করেন, এসব অভিজ্ঞতা আসলে মস্তিষ্কের বিভ্রম, ট্রমা বা অচেতন অবস্থার স্মৃতির খণ্ডাংশ।
তবুও কিছু ঘটনা এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানকে ভাবিয়ে তোলে। এর মধ্যে তিনটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের হারবারভিউ মেডিকেল সেন্টারে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন মারিয়া নামে এক নারী। চিকিৎসাকর্মী কিম্বারলি ক্লার্ক শার্প পরে জানান, মারিয়া দাবি করেছিলেন, হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময়টিতে তিনি নিজের শরীর ছেড়ে হাসপাতালের বাইরে ভেসে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি হাসপাতালের এক উঁচু কার্নিশে পড়ে থাকা গাঢ় নীল রঙের একটি টেনিস জুতা দেখেন। এমনকি জুতার সামনের অংশ ক্ষয়ে যাওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পরে শার্প সেই নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ঠিক একই রকম একটি জুতা খুঁজে পান। এ ক্ষেত্রে সমালোচকেরা বলছেন, হয়তো নিচ থেকেই জুতাটি দেখা সম্ভব ছিল এবং মারিয়াও কোনোভাবে এটি আগেই দেখেছিলেন। তবুও ঘটনাটি আজও নিয়ার-ডেথ গবেষণার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ।
আরেকটি বহুল আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৮৮ সালে। ট্রাকচালক আল সুলিভানের ওপেন-হার্ট বাইপাস সার্জারি চলছিল। তখন তিনি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন এবং চোখ টেপ দিয়ে বন্ধ করা ছিল। কিন্তু চেতনা ফেরার পর তিনি চিকিৎসকদের এমন এক অদ্ভুত দৃশ্যের বর্ণনা দেন, যা সবাইকে বিস্মিত করে। সুলিভান বলেন, তিনি যেন শরীরের বাইরে ভেসে উঠেছিলেন এবং দেখেছিলেন, সার্জন দুই হাত ডানার মতো নাড়াচ্ছেন।
পরে হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হিরোয়োশি তাকাতা জানান, অস্ত্রোপচারের সময় জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য তিনি প্রায়ই হাত বগলের নিচে গুঁজে কনুই দিয়ে ইশারা করতেন। সুলিভানের বর্ণনার সঙ্গে বিষয়টি মিলে যায়। যদিও সংশয়বাদীদের ধারণা, অজ্ঞান হওয়ার আগমুহূর্তে তিনি হয়তো এই নড়াচড়া দেখে থাকতে পারেন।
সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৯১ সালে প্যাম রেনল্ডস নামের এক নারীর ক্ষেত্রে। মস্তিষ্কের অ্যানিউরিজম অপসারণের জন্য তাঁর শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে নামিয়ে আনা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় হৃৎস্পন্দন বন্ধ রাখা হয় এবং চিকিৎসা যন্ত্রে মস্তিষ্কের কোনো কার্যকলাপ প্রায় ধরা পড়েনি।
কিন্তু পরে রেনল্ডস দাবি করেন, তিনি অপারেশন থিয়েটারের কথোপকথন শুনেছেন এবং অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বর্ণনাও দিতে পেরেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনো এই ঘটনার নির্ভুল ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
এসব ঘটনার সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি প্রশ্ন রয়েই গেছে—মৃত্যুর সীমান্তে গিয়ে মানুষের চেতনা কি সত্যিই শরীরের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে?