মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তিকে ‘ট্রাম্পের আদেশপত্র’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, বাণিজ্যচুক্তির শতাধিক জায়গায় বাংলাদেশ কী কী করতে বাধ্য, সেটা লেখা আছে। এটা কোনো চুক্তি না। পুরো চুক্তিপত্রটা হচ্ছে মার্কিন আদেশপত্র। ট্রাম্পের আদেশপত্র।
আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত সম্মিলিত গণপ্রতিবাদ অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন এ অর্থনীতিবিদ। এই চুক্তি বাতিলের দাবিতে আগামী জুলাই মাসে বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে মহাসমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এই বাণিজ্যচুক্তিতে সাক্ষরকারীদের সমালোচনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের পক্ষে যারা স্বাক্ষর করেছেন–তাঁরা দেখতে বাংলাদেশের মানুষের মতো চেহারার কিন্তু তাঁরা আসলে মার্কিন প্রশাসনের লোক। তাঁদের মেরুদণ্ড নাই, কোনো দায়–দায়িত্ব নাই এবং দেশের সর্বনাশ করতে তাঁদের কোনো কুণ্ঠা নাই।
আনু মুহাম্মদ দাবি করে বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেকগুলো রাজ্য আছে। যদি ফেডারেল সরকার এই ধরনের কোনো চুক্তি বা আদেশপত্র তাদের রাজ্যকে দেয়, সেই রাজ্যই এটা মানবে না।’
তিনি অভিযোগ করেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশকে বেশি দামে এলএনজি, বিমান ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে হবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে কৃষি, পোলট্রি ও ডেইরি খাতে বিদ্যমান কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, শুল্কমুক্ত আমদানির ফলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও এই চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে দুর্বল করবে বলেও দাবি করেন তিনি।
এই সমাবেশে শ্রমিকনেত্রী মোশরেফা মিশু বলেন, একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য সংসদে মার্কিন চুক্তি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও তা আর এগোয়নি। তাঁর ভাষ্য, দেশের মানুষ এখনো চুক্তির বিস্তারিত বিষয়ে জানে না, অথচ এর প্রভাব সর্বক্ষেত্রে পড়বে।
গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের সমন্বয়ক দিলীপ রায় তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, বর্তমান সংসদে কার্যকর বিরোধী দল নেই এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামশেদ আনোয়ার তপন সরকারকে সতর্ক করে বলেন, ‘এই সরকার যদি এই চুক্তি বাতিল না করে, তাহলে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধেও আরেকটা গণ-অভ্যুত্থান হবে।’
এই সমাবেশ থেকে আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, নারী ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে নিয়ে একটি মহাসমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সমাবেশে ‘তোরা কি শালার ব্যাটা’ শিরোনামের একটি কবিতা আবৃত্তি করেন কবি হাসান ফখরি। এতে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির পরিণাম’, ‘বাড়বে গ্যাস, ওষুধ ও নিত্যপণ্যের দাম’, ‘ট্রাম্পের আদেশপত্র মানতে আমরা বাধ্য নই’ এবং ‘বাংলাদেশ কারও গোলামি করবে না’ লেখা সংবলিত বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড দেখা গেছে।
সমাবেশের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি দেওয়ার ঘোষণা দেন আয়োজকেরা। চিঠিটি পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসাহিদা সুলতানা।
চিঠিতে বলা হয়, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আপনারা নিজেদের গুরুতর দায়িত্ব আর উপেক্ষা করবেন না এবং জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই এই বাণিজ্য চুক্তি নামের মার্কিন ‘আদেশপত্র’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে (চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে) তা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এই চুক্তির ফাঁস থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করবেন। সেই সঙ্গে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এমন অসম–অন্যায্য চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, উপযুক্ত তদন্ত করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানাই।
সমাবেশে চিকিৎসক হারুন-অর-রশীদ, আইনজীবী মানজুর আল মতিন, শিক্ষক মোসাহিদা সুলতানা রিতু, চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান, গবেষক ও শিক্ষক মাহা মীর্জা, শিল্পী ওয়ারদা আশরাফ, শিল্পী হুমায়ূন আজম রেওয়াজ, অ্যাকটিভিস্ট বাকী বিল্লাহ, নারী নেত্রী সীমা দত্ত, শিল্পী বিথী ঘোষ, গবেষক মাহতাবউদ্দিন আহমেদ, শ্রমিকনেতা শহীদুল ইসলাম সবুজ, মানস নন্দী ও কাজী আলাউদ্দীনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা–কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।