বিএনপির ইশতেহার
নির্বাচনে ভোটারদের জন্য কী কী প্রতিশ্রুতি থাকছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল বিএনপি। একই সঙ্গে ভোটে জিতে ক্ষমতায় গেলে কোন নীতি-আদর্শে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, তা-ও তুলে ধরেছে দলটি।
নির্বাচনের ছয় দিন আগে গতকাল শুক্রবার বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। রাজধানীর একটি হোটেলে বিকেলে বিএনপির ইশতেহার তুলে ধরেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ইশতেহারে দুর্নীতি দমন এবং আইনের শাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ দিয়েছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমরা যদি এই তিনটির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহলে আমরা আমাদের কোনো পরিকল্পনাকেই সফল করতে পারব না।’
নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কয়েকটি দল এরই মধ্যে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে।
বিএনপি তাদের ইশতেহারে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০, রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির ৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়গুলোকে সমন্বয় করে স্থান দিয়েছে।
‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের অঙ্গীকারে ৯টি বিষয়কে ‘নির্বাচনী অঙ্গীকার: প্রধান প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে রেখেছে বিএনপি।
ইশতেহারে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে বিএনপি। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই হবে তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন, বৈষম্যহীন, ন্যায্যতার নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে।
বিএনপি বলেছে, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে—‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
ইশতেহারে দুর্নীতির লাগাম টানতে আপসহীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি বলছে, দুর্নীতির সঙ্গে তারা কোনো আপস করবে না। সমাজের সর্বস্তরে দুষ্টক্ষতের মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও দুর্নীতি দমন আইন সংস্কারের পাশাপাশি পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে দুদকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
ইশতেহার ঘোষণাকালে ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করে বিএনপি। কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য খালেদা জিয়ার সরকার তৎকালীন ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’কে সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা হিসেবে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ গঠন করে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিএনপি সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপের কারণে প্রথম বছর থেকেই দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ অগ্রগতি শুরু হয়। ফলে ২০০২ সালে প্রকাশিত টিআইবি রিপোর্টে বাংলাদেশের স্কোর ০.৪ থেকে উন্নীত হয়ে ১.২ হয়। এরপর ২০০৩ সালে ১.৩, ২০০৪ সালে ১.৪, ২০০৫ সালে ১.৫ এবং ২০০৬ সালে ২.০। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে দুর্নীতি কমতে থাকে।
বিগত সরকারের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের লাগামহীন দুর্নীতির ফলে ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের স্কোর আবারও কমতে থাকে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে প্রথম অগ্রাধিকার।’
বেলা সাড়ে ৩টায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের পর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিএনপির ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান। এরপর স্বাগত ভাষণ দেন অনুষ্ঠানের সভাপতি ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী। সব শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
নির্বাচনী অঙ্গীকার: প্রধান প্রতিশ্রুতি
১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ। পর্যায়ক্রমে এই সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো হবে।
২. কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবিমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। এ সুবিধা পাবে মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও।
৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু হবে।
৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সংযুক্তি এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে।
৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু-সহনশীলতা জোরদারে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু হবে।
৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু হবে।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। চীন, পাকিস্তান, ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত; যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া ব্রিটেনসহ ৩৮টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদকদের মধ্যে প্রথম আলোর মতিউর রহমান, যায়যায়দিনের শফিক রেহমান, মানবজমিনের মতিউর রহমান চৌধুরীসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। শরিক দলগুলোর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জাগপার সভাপতি খন্দকার লুৎফুর রহমান এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুর রব ইউসুফী।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর রায় রায়, আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ দলের ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসহ আরও অনেকে অংশ নেন।