হোম > রাজনীতি

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রে দেশ

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফাইল ছবি

দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর নেতৃত্বে তারুণ্য, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মিশেলে মন্ত্রিসভার সদস্যরা গতকাল মঙ্গলবার শপথ নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর দেশ ফিরল গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায়। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিকেলে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে এবং পরে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভার ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। তারুণ্যের আধিক্যের এই মন্ত্রিসভায় বিএনপি জোটের দুটি শরিক দলের দুই নেতাও রয়েছেন। আজ বুধবার বেলা ৩টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক হবে।

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশ একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেল। ১৯৯১ সাল থেকে দেশে দুজন নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তারেক রহমানের মা প্রয়াত খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অপরজন শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে গেছেন। তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। সংসদে এই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির সরকার গঠন করা ছিল সময়ের ব্যাপারমাত্র।

গতকাল তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই সরকার যাত্রা শুরু করল। রেওয়াজ ভেঙে বঙ্গভবনের বদলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জাতীয় সংগীত এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শপথ অনুষ্ঠান। এরপর প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের নাম ঘোষণা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এরপর নিয়ম অনুযায়ী নতুন প্রধানমন্ত্রীকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালনের এবং গোপনীয়তার শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। পরে শপথের নথিতে সই করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

নতুন প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানানোর পর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং শপথ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়। এরপর ২৫ জন মন্ত্রীকে পর্যায়ক্রমে শপথ এবং গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি। সবশেষে ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করে তাঁদের শপথ গ্রহণের আহ্বান জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নথিতে সই করার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

এর আগে সকালে জাতীয় সংসদের শপথকক্ষে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন নবনির্বাচিত এমপিরা। প্রথমে বিএনপি জোটের এবং পরে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের এমপিরা শপথ নেন। সবশেষে শপথ নেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্যরা। এই শপথ পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। জামায়াত জোটের এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি জোটের কেউ এবং স্বতন্ত্র সদস্যরা এই শপথ নেননি।

শপথ অনুষ্ঠানে স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে আসেন তারেক রহমান। শপথ অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টাদের মধ্যে আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, চৌধুরী রফিকুল আবরার, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সিইসি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধানেরা, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমবিষয়ক মন্ত্রী নালিন্দা জয়াসিতা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মাসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদসহ মাত্র আটজন প্রয়াত খালেদা জিয়ার বিভিন্ন মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। বাকিদের মধ্যে নিতাই রায় চৌধুরী এরশাদ সরকারের শেষ সময়ে মন্ত্রী ছিলেন। তারেক রহমান এবারই প্রথম সংসদ সদস্য হয়েছেন। বাকি ৪০ জনও এবার প্রথম মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হলেন।

মন্ত্রিসভার বড় চমক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের দায়িত্ব পালন করা খলিলুর রহমান। বিএনপি গত বছর তাঁর অপসারণও চেয়েছিল। পররাষ্ট্র ক্যাডারের সাবেক এই কর্মকর্তা এমপি না হলেও টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হয়েছেন। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হয়েছেন আরও দুজন। তাঁরা হলেন কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক ফুটবলার মো. আমিনুল হক। আমিন উর রশিদ মন্ত্রী ও আমিনুল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছেন আমিনুল। তিনি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।

মন্ত্রিসভায় জায়গা হয়নি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খানের। তাঁরা খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার, সাবেক প্রতিমন্ত্রী সেলিমা রহমান এবং বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খানও মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকতউল্লা বুলু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আমান উল্লাহ আমানেরও জায়গা হয়নি নতুন সরকারে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের নাম টেকনোক্র্যাট হিসেবে শোনা গেলেও তা হয়নি।

জোটের শরিক দলের নেতাদের মধ্যে নির্বাচনে বিজয়ী গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান রাতে শেরেবাংলা নগরে তাঁর বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন। এ সময় স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

মন্ত্রিসভা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৫ জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেই। বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত নোয়াখালীও এর মধ্যে রয়েছে। বড় জেলার মধ্যে বাদ পড়েছে খুলনা। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জামায়াত-অধ্যুষিত জেলাগুলোও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পায়নি।

এবারের মন্ত্রিসভায় এমন অনেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন, যাঁদের বাবা অতীতে বিএনপির মন্ত্রিসভায় ছিলেন। যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই হেরেছে বিএনপি। অপর আসনে জয়ী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। তাঁর বাবা তরিকুল ইসলাম খালেদা জিয়ার সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত বলে পরিচিত গোপালগঞ্জে এবারই প্রথম তিনজন সংসদ সদস্য পেয়েছে বিএনপি। তবে তাঁদের কেউ মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর একজন করে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।

রাজধানীসহ ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি। রাজধানী থেকে শেখ রবিউল আলম প্রথমবার এমপি হয়েই পূর্ণ মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। রাজধানী থেকে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন চারজন। ঢাকার পাশের জেলা মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর থেকে কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি।

মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকে জাতীয় সংসদের আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ জড়ো হন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শপথ অনুষ্ঠান দেখার জন্য রাখা হয় বেশ কয়েকটি ডিজিটাল ডিসপ্লে ও সাউন্ড বক্স। শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে জাতীয় সংসদ ভবন এবং আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সার্বক্ষণিক কঠোর নজরদারি দেখা গেছে।

মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক আজ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক হবে আজ। বেলা ৩টায় সচিবালয়ে এই বৈঠক হবে বলে জানান বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ সকাল ১০টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। পরে বেলা ১১টায় শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবেন এবং কবর জিয়ারত করবেন।

সরকারি দল জুলাইকে উপেক্ষা করেছে: জামায়াত আমির

ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করলেন এমপি আতিক মুজাহিদ

খলিলুর রহমানের মন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং উন্মোচন হচ্ছে: নাহিদ

জামায়াত আমিরের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের সাক্ষাৎ

যে সাজে বাবার শপথ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন জাইমা রহমান

নির্বাচনী বাঁটোয়ারা মেনে নিয়ে বিরোধিতার নাটক বন্ধ করুন: মাহফুজ আলম

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর, উপনেতা তাহের ও চিফ হুইপ নাহিদ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জি এম কাদেরের অভিনন্দন

তারেক রহমানকে জাতীয় পার্টির একাংশের অভিনন্দন

নতুন সংসদ হবে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু: মির্জা ফখরুল