২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ৯ দফার অন্যতম ছিল ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি’ বন্ধ করা। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। দুই বছর এসে ছাত্রসংগঠনগুলোর আক্ষেপ, সেই দাবি এখনো পূরণ হয়নি। সংগঠনগুলো বলছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে চলমান অস্থিরতার কারণ লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফার সপ্তম দফা হিসেবে থাকা এই দাবি পূরণ না হওয়ার জন্য পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে ছাত্রসংগঠনগুলো। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বলেছে, তারা ওই দাবি ওই সময়েই প্রত্যাখ্যান করেছিল। অভিযোগ রয়েছে, যাঁরা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছিলেন, তাঁরাই এখন লেজুড়বৃত্তিতে জড়াচ্ছেন। ছাত্র-সংগঠনগুলো দলীয় স্বার্থ বাস্তবায়নে যতটা তৎপর, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে ততটা সোচ্চার নয়।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও এমনটাই মনে করেন। তিনি বলেছেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর দেখা যাচ্ছে, নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানপূর্ববর্তী সময়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনই সক্রিয় রয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর আত্মপ্রকাশ করা নতুন রাজনৈতিক দলও ছাত্রসংগঠন করেছে। আবার যারা নিজেদের স্বতন্ত্র ছাত্রসংগঠন বলে দাবি করে, তাদেরও রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করতে দেখা গেছে। অতীতের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলো সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। হঠাৎ করে অন্তত সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গত সোমবার রাত থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) ও নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। গতকাল বিভিন্ন জেলায়ও এ তিন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে মারামারি হয়েছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির চর্চার কারণেই ক্যাম্পাসগুলো বরাবরের মতো আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে। বর্তমানে যে তিন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা, সংঘর্ষ হয়েছে, তার মধ্যে ছাত্রদল ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ছাত্রসংগঠন। ছাত্রশিবির জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন এবং জাতীয় ছাত্রশক্তি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন। এই দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। ওই ৯ দফার সপ্তম দাবি ছিল—ঢাবি, জাবি, চবি, রাবিসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনসহ দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্র সংসদকে কার্যকর করতে হবে। প্রায় দুই বছর ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি থেকে ছাত্ররাজনীতি মুক্ত হতে পারেনি বলে মনে করেন ছাত্রনেতারাই।
লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার ওই দাবি তুলে ধরা আব্দুল কাদের এ বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ওই ৯ দফার সপ্তম দাবির উদ্দেশ্য শুধু লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা ছিল না, বরং শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা (পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট) তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
এই দাবির সঙ্গে ওই সময়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একমত ছিল না বলে জানিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির। তিনি বলেন, ‘ছাত্রশিবির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের গুপ্ত রাজনীতি চালিয়ে যেতে প্রতারণামূলকভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি সামনে এনেছিল। আমরা সে সময়ই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। অথচ পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, তারাই দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি করছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের জন্য তাঁরা ভোট চাইতে গেছেন। দলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেই ৯ দফা লিখে দেওয়া হয়েছিল। সপ্তম দফায় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বলতে আমরা কী বোঝাতে চেয়েছিলাম, তা বারবার স্পষ্ট করেছি।’ তিনি বলেন, ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন কাজ করতে পারছিল না। জোরপূর্বক ছাত্রদের আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে নেওয়া হতো। না গেলে নির্যাতন করা হতো। ওই প্রেক্ষাপটে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধের দাবি জানানো হয়েছিল।
জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে ছাত্রশিবিরের নেতাদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ভোট গণতান্ত্রিক অধিকার। কেউ কাউকে ভোট দিতে পারে বা কারও পক্ষে ভোট চাইতে পারে। তিনি মনে করেন, এটা সাংগঠনিক লেজুড়বৃত্তি নয়। ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির’ সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
বর্তমান উত্তেজনা, সংঘর্ষের বিষয়ে ছাত্রশিবিরের সভাপতি বলেন, ক্যাম্পাসে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনে অন্ধ দলীয়করণই সংঘর্ষের মূল কারণ।
অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রসংগঠনগুলো দলীয় স্বার্থ বাস্তবায়নে যতটা তৎপর, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে ততটা সোচ্চার নয়।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের কেন্দ্রীয় সভাপতি তামজিদ হায়দার বলেন, যাঁরা সে সময় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তুলেছিলেন, তাঁরাই এখন সেই ধরনের রাজনীতি করছেন। এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির কার্যক্রম দেখলেই বিষয়টি বোঝা যায়। তারা শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া, ক্যাম্পাসের সংকট বা ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলছে না। বরং এনসিপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাদের বেশি সক্রিয় দেখা যায়। ছাত্রসংগঠন হিসেবে স্বাধীন কর্মসূচির চেয়ে দলীয় কর্মসূচিকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এটিই তো লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বৈশিষ্ট্য।
জানতে চাইলে জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান বলেন, ‘আমরা এনসিপির আদর্শিক সহযোগী সংগঠন। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমরা স্বাধীন। প্রচলিত অর্থে কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসেবে আমরা পরিচালিত হই না। আমাদের নিজস্ব সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি রয়েছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদসহ নানা ইস্যুতে কোনো দল বা সংগঠনের সঙ্গে আমরা পাশাপাশি অবস্থান করতে পারি। শুধু এনসিপি নয়, বিএনপির সঙ্গেও এটা হতে পারে।’
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, একসময় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তোলা তরুণদেরই কেউ কেউ এখন একই ধরনের রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সংস্কৃতি বিলুপ্ত না হলে আমাদের ক্যাম্পাসগুলোতে যে অরাজকতা দেখা যায়, তা বন্ধ হবে না।’