ভোটের প্রচারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ মানুষের জন্য বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিএনপি। তবে জামায়াতে ইসলামী বলেছে, তাদের কাছে কোনো কার্ড নেই। দেশের ভোটাররাই তাদের কার্ড। রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ হলে কাউকে বাদ না দিয়ে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়বে তারা।
উত্তরের সর্বশেষ জেলা পঞ্চগড়ে গতকাল দুপুরে জনসভা করেছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট। এরপর দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে একে একে সমাবেশ করে তারা। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানসহ দল ও জোটের নেতারা এসব জনসভায় বক্তৃতা করেন।
ভোটের মাঠে রাজনৈতিক চাপান-উতোর ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের জন্য বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াতের আমির। ক্ষমতায় গেলে উত্তরবঙ্গকে কৃষিশিল্পের রাজধানীতে রূপান্তর করা, দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশন করা, সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলেন তিনি। জামায়াত ও তাদের সঙ্গে জোটে থাকা ৯ দল মিলে এসব সমাবেশের আয়োজন করে।
পঞ্চগড়ের সমাবেশ শুরু হয় গতকাল বেলা ১১টায় শহরের চিনিকল মাঠে। দুপুর ১২টায় ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে সেখানে পৌঁছান জামায়াতের আমির। সেখানে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে তিন শর্তে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সাথে সবাই আসতে পারবেন। তবে আসতে হলে তিনটি শর্ত মানতে হবে। প্রথমত, দুর্নীতি করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ইচ্ছা থাকতে হবে। বিচারব্যবস্থায় কোনো হস্তক্ষেপ করা যাবে না। তৃতীয়ত, গত ৫৪ বছরের বস্তাপচা রাজনীতি বাদ দিয়ে আসতে হবে। গত ৫৪ বছরের রাজনীতি দেশকে শুধু পেছনের দিকে নিয়ে গিয়েছে।’
এ সময় বিএনপির দেওয়া ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে ভোটারদের উদ্দেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কোনো কার্ড নেই, আপনারাই আমাদের শক্তি, আপনারাই আমাদের কার্ড।’
উত্তরবঙ্গকে কৃষিশিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘পঞ্চগড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো আবার চালু করতে চাই।’
উত্তরবঙ্গকে পরিকল্পিতভাবে গরিব করে রাখা হয়েছে; এ মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই অঞ্চল আমাদের কলিজার অংশ। অথচ ইচ্ছে করেই একে পিছিয়ে রাখা হয়েছে, অবহেলা করা হয়েছে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বলছি, উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে দিতে পাঁচ বছরই যথেষ্ট। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
বক্তব্য শেষ করে প্রথমে জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত পঞ্চগড়-১ আসনের প্রার্থী সারজিস আলমের হাতে শাপলা কলি প্রতীক তুলে দেন জামায়াতের আমির। এরপর পঞ্চগড়-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সফিউল আলমের হাতে তুলে দেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক।
সমাবেশে সারজিস আলম তাঁর বক্তব্যে দখলদার, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বয়কট করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘যারা দিনে মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু রাতে মাদক ব্যবসার লাভের ভাগ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে।’
সারজিস আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা একটি ধাপ অতিক্রম করেছি। ২০২৬ সালের নির্বাচন নির্ধারণ করবে আমরা সামনে এগিয়ে যাব, নাকি আবার পেছনের দিকে ফিরে যাব। আমরা কি চাঁদাবাজির দিকে ফিরে যাব, নাকি চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ব—এই নির্বাচনই তার ফয়সালা দেবে।’
দিনাজপুরের বড় মাঠে সমাবেশ শুরু হয় বেলা ২টায়। সেখানে জামায়াতের আমির দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন। এ ছাড়াও তিনি বলেন, ‘কৃষিকে আর পুরোনো ধাঁচে চালানো হবে না। এখানে আধুনিকায়ন করে, আধুনিক লজিস্টিক সরবরাহ করে ন্যায্যমূল্যে তা কৃষকের হাতে তুলে দিয়ে আমরা এই জমির উৎপাদন বাড়িয়ে তুলব।’
শফিকুর রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, জায়গায় জায়গায় ফসল ও সবজির সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হবে। সারা বছর দেশের মানুষ ন্যায্য দামে কৃষিপণ্যগুলো পাবেন বলেও আশ্বাস দেন জামায়াতের আমির।
বিকেল ৪টায় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে অন্য আরেকটি সমাবেশের আয়োজন করে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াত। সে সমাবেশে সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে, যাতে শিল্পের বিকাশ ঘটে এবং কৃষিভিত্তিক পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে।’
সন্ধ্যা ৬টায় রংপুর শহরের পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে জামায়াতসহ জোটের অন্যান্য দলের আয়োজনে গতকালের শেষ সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জামায়াতের আমির তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন ভোটারদের কাছে। তিনি বলেন, ‘যদি আল্লাহ তাআলা দায়িত্ব দেন, তবে উত্তরবঙ্গ থেকেই সর্বপ্রথম উন্নয়নের কাজ শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি এবং তিস্তাকে জীবন দেওয়ার মাধ্যমে গোটা উত্তরবঙ্গকে জীবন্ত করে তোলা হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরবঙ্গে উন্নয়নের জোয়ার আসবে এবং কৃষকদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে।’
জামায়াত তার দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করবে উল্লেখ করে আমির বলেন, ‘জনসাধারণের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে অতীতে অনেকে কথা দিয়ে রাখেনি, তবে এদের ওপর কেন বিশ্বাস রাখা হবে? ৫ আগস্টের পর তারা কথা রেখেছে; মজলুম হওয়া সত্ত্বেও কারও ওপর প্রতিশোধ নেয়নি এবং কোনো প্রকার চাঁদাবাজি বা মামলা বাণিজ্যে লিপ্ত হয়নি।’
রংপুরের সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা এতটুকু চাই, আমাদের রংপুরের মানুষের জমি, ভিটেবাড়ি ও ঘরবাড়ি যেন নদীগর্ভে বিলীন না হয়। ভারতের কর্তৃপক্ষ বর্ষাকালে পানি ছেড়ে দেওয়ার অন্তত তিন দিন আগে আমাদের যেন জানায়, যাতে তিস্তা পারের মানুষেরা তাদের ফসল ঘরে তুলতে পারে এবং ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে পারে। আমরা ভারতের সাথে এমন ন্যায্যতার সম্পর্ক চাই।’
আখতার আরও বলেন, ‘১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষ থেকে কথা দিচ্ছি, আমরা রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি রংপুরের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করব। আমরা মানুষের কাছে এমন ওয়াদা দিতে চাই, যা পরিপালন করতে পারব। জনগণের সাথে ধোঁকাবাজি করা আমাদের কাজ নয়।’
সমাবেশের শেষ দিকে জামায়াতের আমির রংপুর-১ আসনে জামায়াতের রায়হান সিরাজি (দাঁড়িপাল্লা), রংপুর-২ আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা), রংপুর-৩ আসনে জামায়াতের মাহবুবুর রহমান বেলাল (দাঁড়িপাল্লা), রংপুর-৪ আসনে এনসিপির আখতার হোসেন (শাপলা কলি) ও রংপুর-৫ আসনে জামায়াতের গোলাম রব্বানীর হাতে (দাঁড়িপাল্লা) নির্বাচনী প্রতীক তুলে দেন।