দলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এবং সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বঞ্চিত, কোণঠাসা ও নিষ্ক্রিয় নেতাদের টানতে চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বড় দলগুলোর ক্ষুব্ধ, অসন্তুষ্ট নেতাদের এনসিপিতে ভেড়ানোর এই চেষ্টা চলছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির ‘নির্দোষ’ নেতারাও এই সুযোগ পেতে পারেন। এনসিপির নেতাদের সূত্রে এসব জানা গেছে।
এনসিপির বিভিন্ন সূত্র বলছে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা, পদবঞ্চিত ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা তৃণমূল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতার মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাঁরা যথার্থ মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন। এই নেতাদের কেউ কেউ এনসিপিতে যোগ দিতে যোগাযোগ করেছেন। আবার বিভিন্ন বড় দলের সৎ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অনেকের সঙ্গে এনসিপির পক্ষ থেকেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলে ভেড়ানোর জন্য এই যোগাযোগ ও দর-কষাকষি চলছে।
জানতে চাইলে এনসিপির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সারজিস আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যেকোনো রাজনৈতিক দলে অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন, যাঁদের বিভিন্নভাবে বঞ্চিত করা হয়। স্বজনপ্রীতি, পরিবারতন্ত্রের কারণে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক যোগ্য নেতা-কর্মী মূল্যায়ন পান না। আমরা তাঁদের এনসিপির পক্ষ থেকে সেই সুযোগ করে দিতে চাই। এ জন্য পুরো দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যেসব ত্যাগী নেতা-কর্মী আছেন, দল যাঁদের মূল্যায়ন করতে পারছে না, আমরা তাঁদের কাছে যাচ্ছি। তাঁরাও অনেকে আমাদের কাছে অ্যাপ্রোচ করছেন। তাঁদের জন্য এনসিপির দরজা সব সময় উন্মুক্ত।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল এনসিপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের শরিক হয়ে। নির্বাচনে দলটি ছয়টি আসন পেয়েছে। সংসদ নির্বাচনের আগেও এনসিপির শীর্ষ নেতারা সৎ, যোগ্য রাজনীতিবিদদের নিজেদের দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চারবারের সাবেক এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) মনজুর কাদের বিএনপি ছেড়ে এনসিপিতে যোগ দিয়ে সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে এনসিপির প্রাথমিক মনোনয়নও পেয়েছিলেন।
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিসহ বড় দলগুলোর নিজেদের বঞ্চিত মনে করা নেতাদের দলে টানার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিপি। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও বিএনপির নেতা মনজুর আলমের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর দেখা করাকে এরই অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
রাজনীতিসংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করছেন, বড় দলের ‘বঞ্চিত’ নেতাদের দলে টানার চেষ্টার এই সময়ে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর হঠাৎ মনজুর আলমের বাসায় যাওয়া একটি ইঙ্গিত জোরালো করছে। এর উদ্দেশ্য হয়তো মনজুরকে এনসিপিতে ভিড়িয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী করার বিষয়ে আলোচনা করা। তবে ওই বাসায় হাসনাত আবদুল্লাহর যাওয়ার খবরে নিজেদের জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দিয়ে একদল লোক সেখানে জড়ো হন। মনজুর আলম সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় তাঁরা তাঁকে ‘দোসর’ আখ্যা দেন।
এদিকে এনসিপির যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তি গতকাল এক সংবাদ বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, মনজুর আলমের বাসায় হাসনাত আবদুল্লাহ গেলে যুবদল ‘মব’ করে তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছে।
এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্যের বিষয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মনজুর আলম বিবিসি বাংলাকে জানান, হাসনাত আবদুল্লাহ নিজেই তাঁকে ফোন করে বাসায় আসার কথা বলেন। পরে তিনি দুপুরের খাবারের আমন্ত্রণ জানান এবং বেলা ৩টার দিকে এনসিপি নেতা তাঁর বাসায় আসেন ও একসঙ্গে খাবার খান।
মনজুর আলমকে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী করা হবে কি না, জানতে চাইলে সারজিস আলম বলেন, ‘আগে তো তাঁকে (মনজুর) এনসিপিতে আসতে হবে। এরপর দেখতে হবে, তিনি যেখানে নির্বাচন করতে আগ্রহী, সেখানে আর কারা কারা আগ্রহী, সেটা আমরা বিবেচনা করব। এরপর যদি বিবেচনায় সার্বিকভাবে তিনি এগিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি প্রার্থী হতে পারেন। কিন্তু এগুলো নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগে অফিশিয়ালি এনসিপিতে আসাটা গুরুত্বপূর্ণ।’
এনসিপির নেতারা বলছেন, বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁরা আলোচনা করছেন। এসব আলোচনা সফল হলে এবং ওই নেতারা এনসিপিতে যোগ দিলে তা হবে চমক। মনজুর আলম ছাড়াও চট্টগ্রামের অন্তত তিনজন বিএনপি নেতার সঙ্গে এনসিপির আলোচনা চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে খুব দ্রুত ওই নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে দলে বরণ করে নেওয়া হবে।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সেলের কো-লিড আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘এনসিপি গঠনের পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। অনেকে নিজেরা আগ্রহী হয়েও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। দলে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এটা একটা চলমান ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।’
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী ও জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম বলেন, এনসিপিতে বেশ কিছু চমক আসছে। শুধু বিএনপি নয়, আরও কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের বরণ করে নেওয়া হবে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির নেতারা চাইলে তাঁদেরও দলে নেওয়া হতে পারে বলে জানায় এনসিপির সূত্র। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সারজিস আলম বলেন, যাঁরা অপরাধী, যাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আছে, মামলা আছে, বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে; এমন নেতাদের কোনো সুযোগ নেই। সেটা আওয়ামী লীগ হোক, বিএনপি হোক বা অন্য যেকোনো দলের হোক। যাঁদের ওই ধরনের কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, যাঁদের স্থানীয়ভাবে এখনো গ্রহণযোগ্যতা আছে, যাঁরা সম্মানের সঙ্গে সমাজে আছেন, বিগত দেড় বছরে যাঁদের নিয়ে কোনো অভিযোগ বা ওই ধরনের আইনগত ব্যবস্থা দেখা যায়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’