রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা যে কেউ ভাবেন না, সেটা আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর থেকে স্পষ্ট হওয়া যাবে। চট্টগ্রাম নগরের সার্সন রোডসংলগ্ন জয়পাহাড়ের কোলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এখন শুধু উদ্বোধনের অপেক্ষা। এ সময়ে সেই কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তর করা নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আর এই অপকর্মে যুক্ত আছেন স্বয়ং বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় থলের বিড়াল বের হওয়ার মতোও একটি খবর পাওয়া গেছে।
সেটা আবার তাজ্জব হওয়ার মতো ঘটনা। অনেক আগে থেকেই বিপিসির চেয়ারম্যানসহ সাত পরিচালকের সবাই ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে বসে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন। চেয়ারম্যানসহ এই কর্মকর্তারা চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে আসেন ভ্রমণ করতে। এমনকি দেশে তীব্র জ্বালানি সংকটের সময়েও শীর্ষ কর্তাদের অনেকে চট্টগ্রামে মূল কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন বোধ করেননি।
সরকারের নীতি যেখানে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর এভাবে ঢাকায় স্থানান্তরের পাঁয়তারা জনস্বার্থবিরোধী। সরকারের ভেতরের একটি প্রভাবশালী আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠী এবং কতিপয় জনপ্রতিনিধি এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে চাইছেন। তাহলে জনগণের করের টাকা কেন ব্যয় করা হলো? সে প্রশ্নের উত্তর কে দেবেন? ভবন নির্মাণের আগে কেন সেটা ভাবা হলো না? যেকোনো ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় কাজের সুবিধার জন্য সেখানেই হওয়া উচিত, যেখানে সব ধরনের সাপোর্ট থাকবে। সেই সূত্রে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই হওয়া উচিত। কারণ, দেশের বার্ষিক ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানির শতভাগই চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। এ ছাড়া জ্বালানি তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ইস্টার্ন রিফাইনারিসহ বিপিসির আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবং দেশের মূল জ্বালানি মজুত ও বিতরণের প্রধান প্রধান অবকাঠামো চট্টগ্রামেই অবস্থিত। এ কারণে চট্টগ্রামকে দেশের জ্বালানির রাজধানীও বলা হয়ে থাকে। সে হিসেবে বিপিসির প্রধান কার্যালয় সেখানে হওয়াই যৌক্তিক।
নিজেরা চট্টগ্রামে এসে দায়িত্ব পালন করার মানসিকতা তৈরি না করে, উল্টো আস্ত প্রতিষ্ঠানটিকেই নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় টেনে নিয়ে যাওয়ার এই আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি একধরনের চরম স্বেচ্ছাচারিতা।
দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো যে এই অন্যায্য দাবিকে বাস্তবায়ন করতে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির আশ্রয় নিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ও অতি দ্রুততার সঙ্গে সেই বিষয়ে মতামত চেয়ে চিঠি-চালাচালি শুরু করেছে।
আমরা আশা করব, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল আমলাদের এই স্বার্থপর ফাঁদে পা দেবে না। অবিলম্বে বিপিসি কার্যালয় স্থানান্তরের এই গণবিরোধী ও অযৌক্তিক তৎপরতা বন্ধ এবং চট্টগ্রামের নবনির্মিত নিজস্ব ভবনেই এর পূর্ণাঙ্গ প্রধান কার্যালয় উদ্বোধন করে দেশের জ্বালানি খাতকে আরও গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করা হোক। একই সঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের প্রধান কার্যালয়ে অফিস না করার জন্য আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক।