ইতিমধ্যে দেশের জনগণ জেনে গেছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে ১২০টির নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বিরোধী দলের আপত্তির পরও বাতিল করা হয়েছে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ। এই বাতিল অধ্যাদেশগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা হতে পারে, তবে আজ আমরা কথা বলব সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয়বিষয়ক অধ্যাদেশটি নিয়ে। এখানে কোনো শুভংকরের ফাঁকি আছে কি না, তা খুঁজে দেখা জরুরি।
একটু খোলাসা করেই আলোচনাটি করা যাক। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি সব সরকারের আমলেই সোনার পাথরবাটি হিসেবে রয়ে গেছে, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। ক্ষমতায় যখন যে দল থাকে, তখন বিষয়টি তাদের চোখে পড়ে না। ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে কেউ কেউ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। আদতে বিচার বিভাগের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় ক্ষমতাসীন দল; এ ব্যাপারে লুকোছাপা নেই।
স্মরণ করা যেতে পারে, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে আইনিপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০০৭ সালে পৃথক হয়েছিল। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার জন্য ১৯৯৪ সালে একটি রিট মামলা করেছিলেন জেলা জজ ও জুডিশিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব মাসদার হোসেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে সেই মামলার চূড়ান্ত রায় হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। রায়ের আট বছর পর ২০০৭ সালে মূল নির্দেশনাটি বাস্তবায়ন করে বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়েছিল।
কিন্তু আদতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগ পৃথক্করণের লক্ষ্য সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয়নি। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বিচারপতির বিচারের রায় প্রভাবমুক্ত না-ও হতে পারে—এমন শঙ্কা থেকে যায়।
রাজনীতির ছাত্র মাত্রেই জানেন, গণতন্ত্রে আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ বলে তিনটি স্তম্ভ থাকে। এই তিন বিভাগ আলাদা থাকার অর্থ হলো, কোনো প্রতিষ্ঠান যেন স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞায় অন্য বিভাগগুলোকে চলতে বাধ্য করা হয়।
বিচার বিভাগ যদি নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, তাহলে কি নিরপেক্ষ বিচার করা সম্ভব?
প্রশাসনিকভাবে আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর যদি সুপ্রিম কোর্ট নির্ভরশীল থাকেন, তাহলে সুপ্রিম কোর্টের বাজেট অনুমোদন, তাঁদের জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা থাকবে না। আলাদা সচিবালয় থাকলে নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন।
কবে কখন সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় নিয়ে বিএনপি সরকার ভাববে, সেটা জানার কোনো উপায় নেই। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে নিজ দলীয় জনবল নিয়োগের একটা সুপ্ত ইচ্ছার বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে এই দৃষ্টান্ত দেশের জন্য খুব কার্যকর ও শুভ হয়ে ওঠে না। সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় করার কাজটি পিছিয়ে দেওয়া কোনো ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে না।