আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে আইন অমান্য করা একটা স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আইন অমান্য করে অবৈধভাবে পাকা ঘর ও রাস্তা নির্মাণ করা নিয়ে একটি সংবাদ আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ৫৩ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে এ জেলাজুড়ে।
সেখানে শত বছর ধরে স্থানীয়রা বনে কাঁচা ঘর নির্মাণ করে বসবাস করে আসছে। তবে কয়েক বছর ধরে পাকা ঘর নির্মাণ করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। পাহাড় ও টিলা কাটার ফলে বনের মাটির গঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর চেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে বনের আদি বাসিন্দা—হরিণ, উল্লুক, হনুমান, শূকর এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্য প্রাণীর জীবনে। পাকা স্থাপনা ও মানুষের কোলাহল বাড়ার কারণে বন্য প্রাণীর অবাধ বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বনের বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) আজ ধ্বংসের মুখে। এমনিতেই দেশে দিন দিন বনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। মানুষের লোভই বন ধ্বংসের অন্যতম কারণ।
বনের ভেতরে যেখানে কাঁচা ঘর করে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকার নিয়ম, সেখানে ইট-পাথরের এই অবৈধ দেয়াল তোলার মহোৎসব কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনের ভেতরে যেকোনো ধরনের পাকা স্থাপনা তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বনের বুক চিরে শুধু পাকা বাড়িই উঠছে না, পিচঢালা রাস্তাও তৈরি করা হচ্ছে। আর এসব অপকর্ম করা হচ্ছে বন কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই। যাঁদের এসব অপকর্ম প্রতিরোধ করার কথা, তাঁরাই সেসব করার অনুমতি দিচ্ছেন। এভাবে বন ধ্বংস করতে রক্ষকই যদি ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে, তবে বনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে কেবল ‘আইন অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’—এমন চর্বিতচর্বণ আশ্বাসে আর কাজ হবে না। এখনই যদি বন বিভাগ শক্ত হাতে এই অবৈধ দখলদারত্ব রুখে না দেয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এসব বনাঞ্চল ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে।
এখনই করণীয় হলো, মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চল বাঁচাতে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা। বনের ভেতর যত অবৈধ পাকা স্থাপনা গড়ে উঠেছে, সেগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব বন কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা বা দুর্নীতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাঁদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বনের নিয়মকানুন কঠোরভাবে পালন করার নির্দেশ দিয়ে বলতে হবে—বনের সুরক্ষায় তাঁরা সহযোগী মাত্র, কিন্তু তাঁরা কোনোভাবেই বন ধ্বংসকারী হতে পারেন না।
প্রকৃতি, বনভূমি আর বন্য প্রাণী ছাড়া সমাজের ইকোসিস্টেম ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে বাধ্য। তাই কিছু লোভী মানুষের কারণে এভাবে বনভূমি ধ্বংস করতে দেওয়া যাবে না। প্রশাসনের উচিত এখনই মৌলভীবাজারের বনাঞ্চল রক্ষায় আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করা।