অনেকেই ধর্ষকদের অবিলম্বে শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য সোচ্চার হয়েছেন। মূলত আইনি পথে ধর্ষণ মামলার দীর্ঘসূত্রতাই এ ধরনের দাবির মূল কারণ। ধর্ষক যদি শাস্তি পেত, ধর্ষক যদি বুঝত, ধর্ষণ করে পার পাবে না সে, তাহলে এই অপরাধ করার প্রবণতা কমে যেত। কিন্তু আমাদের দেশে আইন সব সময় কার্যকর হয় না, তাই যেকোনো অপরাধ সংঘটনের সময় তার পরিণাম নিয়ে অপরাধীরা খুব একটা চিন্তিত হয় না।
বিচার না করেই শাস্তি দেওয়া কিংবা বিচারের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হলে দেশে ধর্ষণ কমে যাবে, এমন নয়। কিন্তু কেন মানুষ সে রকম বিচার চাইছে, সেটাও ভেবে দেখতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে এই দাবিতে মানুষ আরও বেশি করে ঐক্যবদ্ধ হবে। বহু জায়গায় ধর্ষককে জনতার হাতে ছেড়ে দেওয়ার যে দাবি উঠেছে, তার কারণ খতিয়ে দেখতে হবে।
আমরা আগেও বলেছি, মূল জায়গায় হাত না দিলে বিচ্ছিন্নভাবে ধর্ষণের নৃশংসতা ঘটে চলবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাবে, নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে কিন্তু শাস্তির পথ প্রশস্ত হচ্ছে না। ইদানীং উদ্বেগজনকভাবে শিশু ধর্ষণের খবর বেশি প্রকাশিত হচ্ছে, যা সমাজের অবক্ষয়কেই প্রমাণ করে। এ ধরনের গুরুতর অপরাধের পরও অপরাধীরা মামা-চাচার জোরে দিব্যি পথঘাটে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে। আমাদের দেশে আইনের শাসনকে বাধাগ্রস্ত করার বহু পথ খোলা রয়েছে। ক্ষমতা কারও হাতে থাকলে কেউ কেউ আইনি ও বে-আইনি পথের পার্থক্য অনুধাবন করতে পারে না। অপরাধী টাকা দিয়ে সবকিছু ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সফলও হয়।
একটি অপরাধের ঘটনা নিয়ে মানুষ সোচ্চার হওয়ার পরপরই ঘটে যায় আরেকটি অপরাধ। তখন সবাই পুরোনো অপরাধের ঘটনা ভুলে গিয়ে নতুন অপরাধ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবাই ভুলে যায় পুরোনো দিনের ঘটনা, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এক বুক কষ্ট নিয়ে নিজেদের দুঃস্বপ্নকে লালন করে।
পারিবারিক শিক্ষা, আশপাশে থাকা মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, শিক্ষালয়ে অপরাধের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স শেখানো, ভালো ও মন্দ ছোঁয়ার পার্থক্য বোঝানো না হলে সমাজে এই অপরাধীরা টিকে থাকবে। সামাজিক বলয়ে শিশু-নারী ও বর্ষীয়ানদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। এই মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় এবং এদের সামাজিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া না হলে অপরাধের চিত্র পাল্টাবে না।
আরও একটি বিষয়ে সমাজের সব পেশার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। অনলাইনের কারণে শিশুদের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে, সে কথা যেন আমরা বুঝতে পারি। অনলাইনে যখন লালসা চরিতার্থ করার নানা উপায় কেউ দেখে, তখন সে তা শিখে ফেলে এবং বাস্তবে তার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। সেই প্রবণতা রুখতে হলে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। বিচারে শাস্তি নিশ্চিত হোক আর সেই সঙ্গে সমাজে একে অন্যের প্রতি নির্ভরতা ফিরে আসুক। দলমত-নির্বিশেষে প্রত্যেকে যেন অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, সেটাই কাম্য।