আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তবে পরিবহনমালিক ও শ্রমিক সংগঠনের ‘কল্যাণ তহবিল’-এর নামে অর্থ আদায়কে চাঁদাবাজি না বলার যে যুক্তি তিনি দিয়েছেন, তা জনমনে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, নিবন্ধিত শ্রমিক সংগঠনগুলো যদি তাদের নিজস্ব তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে, তবে তা চাঁদাবাজি হিসেবে গণ্য হবে না। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সঠিক মনে হলেও দেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থায় চাঁদাবাজির ব্যাপারটি একদম ভিন্ন চরিত্রের। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই ‘কল্যাণ তহবিলের’ আড়ালে সাধারণ পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের ওপর বাধ্যতামূলক বিশেষ চাঁদা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ যাত্রীদের ওপর। যখন সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিকবার অর্থ আদায় করা হয়, তখন ‘বৈধতা’ ও ‘চাঁদাবাজির’ মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই ধরনের অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং স্বচ্ছতা থাকা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
প্রতিবছর ঈদের আগে দেখা যায়, বাড়তি ভাড়ার নৈরাজ্য সাধারণ মানুষের আনন্দের যাত্রাকে বিষাদে পরিণত করে দেয়। যদিও এবার মন্ত্রী হুঁশিয়ারি করে বলেছেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক টাকাও বেশি নেওয়া হলে রুট পারমিট বাতিলসহ নানা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে শুধু হুঁশিয়ারি দিয়ে অতীতে এই সিন্ডিকেটকে থামানো যায়নি। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারি কেবল বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক না রেখে সড়কের মাঝপথের পয়েন্টগুলোতেও জোরদার করা জরুরি। কারণ, যাত্রাপথের বিভিন্ন পয়েন্টেই বেশি চাঁদাবাজি হয়ে থাকে।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় এবার যানজটের সম্ভাব্য স্পট ১৫৯টি থেকে বেড়ে ২০৭টি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের স্পটগুলোর সংখ্যা ভাবিয়ে তোলার মতো। কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে যানজট কমানো সম্ভব নয়, যদি না ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং যাত্রাপথে গাড়িগুলো শৃঙ্খলা নিয়ে না চলে। এ ক্ষেত্রে চালকেরও ভূমিকা আছে। সরকার ‘স্বস্তির ঈদযাত্রা’ নিশ্চিত করতে চায়—এটি ইতিবাচক। কিন্তু মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চালক-হেলপার ও যাত্রীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব।
কল্যাণ তহবিলের নামে যাতে কোনো পকেট কাটা না হয় এবং বাড়তি ভাড়ার জুলুম থেকে সাধারণ মানুষ যাতে রেহাই পায়, সেটি নিশ্চিত করাই এবারের ঈদযাত্রার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা আশা করব, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি কেবল মন্ত্রীর বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যাত্রাপথে দৃশ্যমান হবে। একটি নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত ঈদযাত্রাই নতুন সরকারের কাছে সবার প্রত্যাশা।