তুচ্ছ হোক কিংবা বিশাল—কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি কোনো বড় সংঘর্ষ হয়, অনেকে ভাবতে পারেন সেটি সংঘটিত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে। তবে এবার অন্য একটি জেলার নাম মনে রাখতে হবে।
সেই জেলার নাম ঝিনাইদহ। জেলার শৈলকুপা উপজেলায় অতিদরিদ্রদের খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং বা ভিজিএফ) চালের কার্ড বিতরণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, তাও সালিস হওয়ার পর। কী আশ্চর্য!
সদ্যই নতুন সরকারের নতুন কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড চালু হয়েছে। যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের তো উপকার হয়েছেই, প্রশংসাও কুড়াচ্ছে সরকার। তবে এই কর্মসূচির ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হবে না—সেই নিশ্চয়তা কিন্তু জনগণ পায়নি এখনো। যেমনটা পায়নি চালের কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে।
ঘটনা ১২ মার্চের। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মির্জাপুর ইউনিয়নের অসহায় দরিদ্রদের মধ্যে ভিজিএফের চাল দেওয়ার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কার্ড ইস্যু করা হলে সেদিন মির্জাপুর ইউনিয়নের চরগোলকনগর গ্রামের ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি সায়েমের কাছে নিজের সমর্থকদের জন্য কিছু কার্ড চান যুবদল নেতা শামীম। কিন্তু ‘মূল দল’ করা বিএনপি নেতা ‘মূল দল’ না করা যুবদল নেতাকে কার্ড দিতে চাননি। কী এক অদ্ভুত যুক্তি! তবে, এ-ও যাচাই করতে হয় যে শামীমের সমর্থকেরা আদতে ‘অতিদরিদ্র’ কি না।
যাই হোক, স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে শুরু হয় তাঁদের বাগ্বিতণ্ডা। ব্যাপারটি সুরাহা করতে সালিস বসে। কিন্তু সালিস শেষে উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত—চার ঘণ্টায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী গিয়ে লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনায় দুই পক্ষের ৪০ জন আহত হয়েছেন, কয়েকজন আটক হয়েছেন পুলিশের হাতে।
আবার ১৩ মার্চ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী ইউনিয়নে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। যেমন এক ব্যক্তি একাধিক কার্ড ব্যবহার করে চাল উত্তোলন করছেন, সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য নাসিমা আক্তার চাল তুলে বাইরে বিক্রি করেছেন, অনেক কার্ডে সুবিধাভোগীর নাম-ঠিকানা উল্লেখ না থাকায় প্রকৃত দুস্থদের শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নাসিমা আক্তার একটি মজার কথা বলেছেন। খেয়ে দেখার জন্য চাল নিয়েছিলেন, মান ভালো না বলে বিক্রি করে দিয়েছেন! কিন্তু তিনি কি সেই চাল উত্তোলন করতে পারেন, যে অন্নের ওপর অন্য কারও অধিকার আছে? বিক্রি করা তো পরের ব্যাপার।
দেখা যাচ্ছে, দুটি ঘটনাতেই বলির পাঁঠা হচ্ছেন যাঁরা প্রকৃত দুস্থ, তাঁরা। মধ্যম কর্তাব্যক্তিদের অনিয়মের কারণে তাঁরা কার্ড বা চাল পাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যাঁরা অনিয়ম করে পার পেয়ে যান, দুর্নীতি করে আরামসে দিন কাটান, তাঁদের জন্য কি এমন কোনো ম্যাজিক কার্ডের ব্যবস্থা করা যায় না, যার মাধ্যমে দুর্নীতি-অনিয়ম করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয়? কারণ, দুস্থরা তো আর থানা-পুলিশের হ্যাপা নেবে না। সরকার কি নেবে?