হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ক্ষমা, রাজনীতি ও ইতিহাসের দায়

সালেক উদ্দিন

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো কখনো পুরোপুরি অতীত হয়ে যায় না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং সে বিষয়ে দলটির আনুষ্ঠানিক অবস্থান তেমনই একটি প্রশ্ন। সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য এবং তার জবাবে জামায়াত নেতা এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের প্রতিক্রিয়া আবারও সেই বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্নটি মূলত রাজনৈতিক নয়, ঐতিহাসিকও। কারণ, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করেন। সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামী আবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসার সুযোগ পায়। পরবর্তী সময়ে দলটি বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক মিত্রতায় আবদ্ধ হয় এবং দীর্ঘদিন জোটগত রাজনীতির মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও বিএনপি তাদেরকে মূলধারার রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে একদিকে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়, অন্যদিকে বিএনপিও একটি নিবেদিত ভোটব্যাংক ও সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করে। কিন্তু রাজনীতির সবচেয়ে বড় সত্য সম্ভবত এটাই—এখানে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই।

একসময় রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনে জামায়াতে ইসলামী এমন অবস্থান নেয়, যা বিএনপির অনেক সমর্থকের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক কৌশল ও ক্ষমতার অঙ্কে দলটি বিএনপির বিপরীত অবস্থানে চলে যায়। পরে আবার ইতিহাস অন্যদিকে মোড় নেয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। আবার সেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে আগে জামায়াতকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এটাই ছিল রাজনীতির খেলা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয় এলেই সামনে এসে দাঁড়ায় জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমা প্রার্থনার প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের একটি অংশ বলে এসেছে, ‘আমরা অপরাধ করিনি, ক্ষমা চাইব কেন?’ যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত নেতাদের অনেকের বক্তব্যেও একই ধরনের অবস্থান দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির নেতারাও প্রায় একই ভাষা ব্যবহার করছেন। অথচ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের স্মরণে আছে, বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের আগে জামায়াতের কিছু নেতা তুলনামূলক নমনীয় ভাষায় অতীতের জন্য অনুশোচনা বা দুঃখ প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যদিও তা কখনো দলীয়ভাবে সুস্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনায় রূপ নেয়নি।

এখানে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হয়। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত তখনই ক্ষমা চায়, যখন তারা মনে করে ক্ষমা চাওয়ার রাজনৈতিক লাভ ক্ষতির চেয়ে বেশি। আবার যখন কোনো দল মনে করে তার রাজনৈতিক ভিত্তি যথেষ্ট শক্তিশালী, তখন সে আপসের প্রয়োজন কম অনুভব করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াতের দৃঢ় অবস্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক সমন্বয় জামায়াতকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিত সাংগঠনিক বিস্তারের মাধ্যমে জামায়াত একটি শক্তিশালী তৃণমূল কাঠামো গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শভিত্তিক ক্যাডার তৈরির ক্ষেত্রে তারা বরাবরই তুলনামূলকভাবে সফল। ফলে দলটি কেবল নির্বাচনী জোটের ওপর নির্ভরশীল নয়।

তৃতীয়ত, দেশের অনেক এলাকায় তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির তৃণমূল সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা বিএনপির কিছু এলাকায় প্রভাব ফেলেছে—এমন মূল্যায়নও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জামায়াত হয়তো মনে করছে যে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অতীতের জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক প্রয়োজন না থাকলেও ঐতিহাসিক দায় কি শেষ হয়ে যায়?

বিশ্বের বহু দেশে দেখা গেছে, কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা রাষ্ট্র অতীতের ভুল স্বীকার করলে তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা নতুন বৈধতা সৃষ্টি করে। ইতিহাসের বিচার এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এক জিনিস নয়। কেউ ১৯৭১ সালে কী অবস্থানে ছিল, সেটি একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন। আর আজকের বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক অধিকার থাকবে কি না, সেটিও গণতান্ত্রিক প্রশ্ন।

জামায়াতের সামনে তাই এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রয়ে গেছে। তারা কি অতীতের বিতর্ককে ‘পুরোনো কাসুন্দি’ বলে উড়িয়ে দেবে, নাকি স্পষ্টভাবে বলবে যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা ছিল একটি রাজনৈতিক ভুল? একই সঙ্গে তাদের সমালোচকদেরও মনে রাখতে হবে, ইতিহাসের বিচার তথ্য ও দলিলের ভিত্তিতে হতে হবে, কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল বহুবার হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো রয়েছে, সেগুলোর উত্তর না দিলে বিতর্কও শেষ হবে না। কারণ, ইতিহাসকে নীরব রাখা যায়, আবার মুছে ফেলাও যায় না।

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সংকট

বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ভাবনা

জলাবদ্ধ নগরে জবাবদিহির খরা

সামাজিক অবক্ষয়ের উৎস কোথায়

প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষার ক্ষতি

হরমুজে লুকিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির চাবি

মিয়ানমারে কেন থামছে না জটিল সংঘাত

ছাত্রদের কাজকর্ম

ফেদেরিকো ফাজিনের ভাবনায় মানুষের ভবিষ্যৎ

মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কতটা যৌক্তিক