হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে

রাজিউল হাসান

বছর ঘুরতেই প্রতিবার আলোচনায় আসেন দুজন ভবিষ্যদ্‌বক্তা। তাঁদের একজন বুলগেরিয়ার রহস্যময় ভবিষ্যদ্‌বক্তা বাবা ভাঙ্গা, যাঁর প্রকৃত নাম ভ্যানগেলিয়া প্যানদেভা দিমিত্রোভা। অপরজন ফরাসি ভবিষ্যদ্‌বক্তা নস্ত্রাদামুস ওরফে মিশেল দ্য নোস্ত্রদাম। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২৫ সাল শেষ হওয়ার আগেই কিছু সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছেন এই দুজন। ২০২৬ সাল সম্পর্কে তাঁরা কী ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন, সেটাই এসব সংবাদের উপজীব্য।

কিছু সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, ২০২৬ সাল নিয়ে বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর অন্যতম একটি হলো—এ বছর বিশ্বের পূর্বাঞ্চলে একটি যুদ্ধ শুরু হবে এবং ধীরে ধীরে তা পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়বে। আর নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে যেতে পারে বিশ্ব। অর্থাৎ দুজনেরই ভবিষ্যদ্বাণী বলছে, বিশ্ব বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে এ বছর।

আমার অবশ্য এসব ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস নেই। এগুলো আমার কাছে ‘শুকনো কথা’। কাজেই ‘চিড়ে ভিজবে না’। তার ওপর বাবা ভাঙ্গা মারা গেছেন ১৯৯৬ সালে। আর নস্ত্রাদামুস প্রয়াত হয়েছেন ষোড়শ শতকে। ফলে ২০২৬ সাল বা তার পরে কী ঘটবে, তাঁদের পক্ষে বলা কীভাবে সম্ভব, সেটা কিছুতেই আমার বোধগম্য নয়। তাই বলে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় না বা তা সত্য হয় না, তা কিন্তু নয়। তবে সেসব ভবিষ্যদ্বাণীকে আমরা পূর্বাভাস বলেই জানি। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে যেতে পারে, তার পূর্বাভাস পাওয়া যায় এসব ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ থেকে। আর এসব ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করেন মূলত বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ গবেষণা-পর্যালোচনার পর।

তাহলে, সংবাদমাধ্যমগুলো বছর ঘুরতেই বাবা ভাঙ্গা কিংবা নস্ত্রাদামুসকে নিয়ে মেতে ওঠে কেন? এর লক্ষ্য হলো পাঠক টানা।

তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এখন বাবা ভাঙ্গা আর নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণীকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে বাধ্য করছে। এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা স্মরণ করা যাক। ২০২৬ সাল শুরু হতে না হতেই ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ধরে এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পরপরই কিউবা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ইরানকে দিয়েছেন হুমকি। ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড ছিনিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েই কেবল থামেননি ট্রাম্প, পাশাপাশি কীভাবে ওই অঞ্চল দখলে নেওয়া যায়, সে পথও খুঁজছেন। এদিকে ইরানে চলছে ব্যাপক বিক্ষোভ। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি তাণ্ডব চলছে দুই বছরের বেশি সময় ধরে। ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবাননেও অশান্তি চরমে। ২০২২ সাল থেকে চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। আফ্রিকা তো বহু বছর ধরেই সংঘাতকবলিত। এসব ঘটনার কোনোটিরই প্রভাব আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। এগুলোর অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক অভিঘাতে পুরো বিশ্ব এখন টালমাটাল। এর মধ্যে ক্ষমতায় আসার পরপরই পাল্টা শুল্কের নামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে বিভিন্ন দেশকে বশে আনার কৌশল নিয়েছেন, তাতে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও ঝুঁকিতে পড়েছে।

রাশিয়া যেদিন ইউক্রেনে হামলা শুরু করেছে, বিশ্ব মূলত সেদিনই অঘোষিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবলে পড়েছে। তারপর দিনে দিনে বিশ্বের নানা প্রান্তে সংঘাত কেবলই বেড়েছে, বেড়েছে সংকট। সব ঘটনা যদি আমরা এক সুতায় গাঁথি, তাহলে দেখা যাবে, বিশ্বের সিংহভাগ এলাকায় অশান্তি চলছে। এর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে আধিপত্যবাদের দিকে ঝুঁকছেন, তাতে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দিনে দিনে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

গত তিন-চার বছরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বিশ্বব্যবস্থা এখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে ভঙ্গুর দশায় আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ‘খোঁড়া হাতি’। তার কথা কেউই শুনছে না। এই বিশ্ব সংস্থার নিরাপত্তা পরিষদের যে পাঁচ স্থায়ী সদস্য রয়েছে, তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একেবারে প্রকাশ্যে জাতিসংঘকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। আরেক স্থায়ী সদস্য চীন এখন পর্যন্ত নীরবতার নীতি অনুসরণ করলেও তারাও চুপচাপ বসে নেই। এই পরাশক্তিগুলো ছাড়াও পরাশক্তি হয়ে ওঠার দৌড়ে থাকা অন্য দেশগুলোও ক্রমেই অশান্তি সৃষ্টির মিছিলে যোগ দিচ্ছে।

এদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও ইউরোপে তাদের সম্প্রসারণবাদ মোকাবিলায় মার্কিন নেতৃত্বে যে ন্যাটো সামরিক জোটের জন্ম হয়েছিল, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তার ভিতও নড়বড়ে হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে তার ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্ক আর আগের মতো উষ্ণ নেই, তা-ও স্পষ্ট। ট্রাম্প তাঁর আগের মেয়াদেও ন্যাটোয় তহবিল প্রশ্নে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে কথার লড়াইয়ে জড়িয়েছিলেন। এবার গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে তিনি হয়তো ন্যাটোরই কবর রচনা করবেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন। আর ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য। এই সামরিক জোটের দুই সদস্য সংঘাতে জড়ালে বাকি সদস্যরা কী করবে, তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। তবে ন্যাটোর ইউরোপীয় বেশির ভাগ সদস্য যে ডেনমার্কের পাশে থাকবে, তা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়।

প্রশ্ন আসতে পারে, ন্যাটো ভেঙে গেলে কার কী? এই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা জবাব, বিশ্বে ক্ষমতার যে যৎসামান্য তথাকথিত ভারসাম্য এখনো টিকে আছে, তার কিছু আর অবশিষ্ট থাকবে না ন্যাটো ভাঙলে। বিশ্বজুড়ে বাড়বে আধিপত্যবাদের প্রভাব। সেই আধিপত্যবাদী তৎপরতার অগ্রভাগে দেখা যাবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রকে। মিত্রদের বাদ দিয়ে ট্রাম্প হয়তো তাঁর দেশকে একক পরাশক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে এসব করবেন। তবে তাতে অনেকগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হবে। সব পরাশক্তিই তখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে যাবে। সবাই মেতে উঠবে নিজ নিজ বলয়ে নিজস্ব আধিপত্য প্রতিষ্ঠায়। লিগ অব নেশনসের মতো ভেঙে পড়বে জাতিসংঘও।

এদিকে মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকে হুমকি দিয়ে ট্রাম্প মূলত দক্ষিণ আমেরিকায় একটি সংঘাতের হুমকি সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে প্রতিবেশী মেক্সিকোর সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো মানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিজ সীমান্তেই যুদ্ধে জড়ানো।

এসব সমস্যার বাইরেও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। কয়েক বছর ধরে বেশ কয়েকটি দেশে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, একনায়কতন্ত্র, দুর্নীতিসহ নানা ইস্যুতে বিক্ষোভ হয়েছে, হচ্ছে। কয়েকটি দেশে এরই মধ্যে বিক্ষোভের জেরে সরকারের পতনও ঘটেছে। দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ এসব ঘটনারও এক ধরনের বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে।

এখন আমরা যদি শুধু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাঁর কথা, হুমকি, পদক্ষেপের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতাগুলোকে এক সুতায় গাঁথি, তাহলে দেখা যাবে এসব সংকটই সম্মিলিতভাবে একটি প্রলম্বিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটাতে যথেষ্ট। সে ক্ষেত্রে বাকি বিশ্বে চলমান সংঘাত-দ্বন্দ্বগুলো সংকট আরও জটিল করবে।

আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

একাকী বার্ধক্য: পরিবার আছে কিন্তু সঙ্গ নেই

সংখ্যালঘুর সীমা পেরিয়ে যাঁরা ব্যতিক্রম

ইরান চুক্তিতে নেতানিয়াহু বেকায়দায় পড়ে গেছেন?

ভারতীয় রাজনীতিতে মমতার রাজনৈতিক অধ্যায় কি শেষ

মাস্টার্স পড়ার সেকাল-একাল

অ্যান্টার্কটিকার নতুন দ্বীপ ও অস্তিত্বের সংকট

শিক্ষা কি তবে শিশুর হাতের মোয়া

উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন জ্ঞানের চর্চাকে মূল্য দেওয়া: অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সাদা চোখে জনতুষ্টির বাজেট, কিন্তু...