হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ভাবনা

মামুনুর রশীদ নাট্যব্যক্তিত্ব

একেবারেই দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা ম্যারাডোনা বস্তির জীবন থেকে খেলতে খেলতেই বিখ্যাত হয়ে যান। ছবি: সংগৃহীত

বানভাসি, দারিদ্র্য, অভাব-অনটন, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি—এসবকে ছাপিয়ে গত এক মাস দেশের মানুষ একটানা ফুটবলের ঘোর ও স্বপ্নের মধ্যে দিন-রাত কাটিয়েছে। এর মধ্যে তাদের জীবনে এসেছে কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ। শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই সংক্রমিত হয়েছে এই ফুটবল-জ্বর।

দুর্ভাগ্য যে ৪৮টি দলের মধ্যে আমাদের দেশ যুক্ত হতে পারেনি। অথচ বাল্যকালে, কৈশোরে অথবা যৌবনে আমাদের দেশেও আমরা ফুটবল-জ্বরে আক্রান্ত হতাম। সেই আন্তস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা থেকে আগাখান গোল্ডকাপ পর্যন্ত অস্থির হয়ে থাকতাম ক্রীড়ার আনন্দে। স্কুলের বাইরেও গ্রামে-গ্রামে টুর্নামেন্ট হতো, একেকটার একেক নামে। সেই বুটবিহীন খালি পায়ে খেলতে দেখেছি, তারপর আস্তে আস্তে বুটের প্রচলন হলো; বাহারি জার্সি এল, সেও এক উত্তেজনা। জাম্বুরা দিয়ে খেলা শুরু করে প্লাস্টিক এবং চামড়ার ফুটবল—যখন যেখানে সম্ভব তা দিয়ে খেলা চলেছে। সারা পৃথিবীর ফুটবলপ্রেমী দেশগুলোতেও একই ইতিহাস।

আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল অথবা কলম্বিয়া, চিলি—সর্বত্রই একই ইতিহাস। একেবারেই দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা ম্যারাডোনা বস্তির জীবন থেকে খেলতে খেলতেই বিখ্যাত হয়ে যান। দক্ষিণ আমেরিকার যেসব ধনী দেশ, কিন্তু মানুষ দরিদ্র, সেসব দেশেও ফুটবল অন্যান্য খেলা থেকে ভীষণ জনপ্রিয়। আজকাল অবশ্য সেসব দেশে ফুটবলাররাও অনেক অর্থ-সম্পদের মালিক। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফুটবলে একটা বড় জোয়ার এসেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেখেছি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করা হয়েছিল। দেশভাগের বেশ আগে থেকে অবিভক্ত বাংলায় ইস্ট বেঙ্গল ও মোহনবাগান দুটি দল পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের প্রতিনিধিত্ব করত। একই সময় ঢাকায় ওয়ারী ক্লাব পূর্ব বাংলা থেকে গিয়ে কলকাতায় যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

ক্রিকেট জনপ্রিয় হলেও অন্তত কলকাতায় এখনো ফুটবল খেলা সংস্কৃতিতে প্রথম স্থানেই রয়েছে। ইস্ট বেঙ্গল ও মোহনবাগানের খেলা যেদিন হয়, সেদিন জনতার স্নায়ুতে এমন চাপ পড়ে যে তার প্রতিফলন পথেঘাটেই দেখা যায়। খেলাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক জীবনেও দ্বন্দ্ব বেধে যায়। আমাদের এখানেও আবাহনী-মোহামেডানকে কেন্দ্র করে পরিবার, সংগঠন, ব্যক্তি বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আমাদের ফুটবল টিম ও খেলোয়াড়েরা দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে। খেলোয়াড়দের সম্মানীও বেড়ে গিয়েছিল। বয়সের একটা পর্যায় পর্যন্ত প্রভূত অর্থের মালিক হয়েছিল। খেলোয়াড় ছাড়াও বিপুলসংখ্যক সমর্থক ও সংগঠক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু কোথা থেকে কী হয়ে গেল। জাতীয় ফুটবল ক্রমাগতভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ল।

ফুটবল জাতীয় রাজনীতিতে স্থান পেয়েছিল। বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অনুসারী ফুটবল দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল। সেই দলগুলোর উত্থান-পতনের সঙ্গে ফুটবলও জড়িয়ে গেল। একটা পর্যায়ে ফুটবল সংকুচিত হয়ে ক্রিকেট সামনে চলে এল। ক্রিকেট অবশ্য বহুদিন ধরেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন দেশগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। যদিও পৃথিবীর একেবারেই কম দেশ ক্রিকেট খেলে থাকে, তার মধ্যে অবিভক্ত ভারতে ক্রিকেট একটা জনপ্রিয় খেলা হিসেবে স্থান করে নিতে পেরেছিল।

দেশভাগের পর পাকিস্তান ক্রিকেট দল প্রতিষ্ঠা করে এবং দুই দেশের রাজনৈতিক লড়াইয়ে ক্রিকেট অংশ নিয়ে ফেলে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যখন বৈরী অবস্থা বিরাজ করে, খেলার মাঠেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। কিন্তু বৈষম্য ছিল ব্যাপক। ভারতের পশ্চিম বাংলার খেলোয়াড়েরা যেমন জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেতেন না, তেমনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরাও পাকিস্তানের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেতেন না। তারপরও ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে ক্রিকেট খেলার একটা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে ক্রিকেটের অব্যাহত অগ্রগতি ফুটবলকে থমকে দেয়। তবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা অব্যাহত গতিতে বাড়তে থাকে। এর মধ্যে আসে বিশ্বকাপ।

যদিও সূচনায় এই খেলা দেখার সুযোগ আমাদের ঘটেনি। খুব উৎসাহী যাঁরা, তারা রেডিওতেই খেলা শুনতেন এবং মানসিকভাবে অংশ নিতেন। ১৯৮০-এর দশকে প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের টেলিভিশনে খেলা দেখার একটা সুযোগ হয়। এ এক অভাবিত আনন্দ। সাদা-কালো টেলিভিশনের যুগ পেরিয়ে আমরা তখন রঙিন টেলিভিশনের দিকে এগিয়ে গিয়েছি। রঙিন জার্সি দেখার জন্য রঙিন টেলিভিশন কেনার একটা হুড় লেগে যায়। আমাদের দেশের মানুষ আন্তর্জাতিক ফুটবলের মান দেখতে পেয়ে তাদের রুচিও উন্নত হতে থাকে। আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়েরাও আমাদের দেশে জনপ্রিয় হতে থাকে। ম্যারাডোনা, সক্রেটিস, জিকো, বেকেন বাওয়ার, আলতু বেলি এবং সেই সঙ্গে পুনঃপ্রচারের কল্যাণে পেলের খেলাগুলো দেখারও সুযোগ ঘটে। কিন্তু নিজেদের দেশের ফুটবলের তেমন উন্নতি ঘটে না।

ফুটবল রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেলেও আগের জায়গায় ফিরতে পারেনি। কিন্তু একটা বড় বিস্ময় দেখা গেল নারী ফুটবলে। একেবারেই অনগ্রসর গ্রামীণ ও শ্রেণিগুলো থেকে বিস্ময়কর সব ফুটবলারের খেলা দেখে আমরা মুগ্ধ হই। সাফ এবং কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তারা অংশ নিতে থাকে।

ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও তাদের এই অগ্রগমন উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীতে এখন কোনো কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। ফুটবলকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু সেখানে সমস্যা হচ্ছে—অনেক জায়গায় ফুটবলের মাঠগুলো দখল হয়ে গেছে। একদা ফুটবল মাঠের কোনো অভাব এ দেশে ছিল না। এমনকি রাজধানী ঢাকা শহরেও। কিন্তু আজ যখন দেখি শিশু-কিশোরেরা কোনো বাড়ির ছাদের ওপর ফুটবল খেলছে, তখন সত্যিই করুণা হয়। আমরা জেনে আসছি ক্রীড়া মানুষের শরীর শুধু নয়, মানসিক গঠনেও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পাকিস্তান আমলেও ক্রিকেট-ফুটবল ছাড়াও বিভিন্ন অ্যাথলেটিকেও আগ্রহ দেখা যেত। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে দৌড়, জাম্প, গোলক নিক্ষেপ, সাঁতার—এসবেও দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কেউ কেউ সুযোগ পেতেন। বেশ কিছুদিন ধরেই প্রযুক্তির অকল্যাণে শিশু-কিশোর, তরুণেরা ইন্টারনেটে খেলতে শুরু করেছে। তাতে মাথাটা হয়তো খুলছে, কিন্তু শরীরটা একেবারেই অন্য পথে ধাবিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জাঙ্ক ফুডের সংস্কৃতি, যা জাতীয় স্বাস্থ্যের জন্য একেবারেই কাম্য নয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেলে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তরুণ-তরুণীদের যেমন দেখা পাওয়া যায় না, তেমনি ফেসবুকেও তাদের উপস্থিতি জাতীয় সংস্কৃতির অনুকূলে নয়।

দেশে একটি ‍ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আছে। আর আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু ক্রীড়ার সঙ্গে শিক্ষার কতটা যোগাযোগ আছে, সন্দেহ জাগে। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ক্রীড়া শিক্ষকের পদটি বিলুপ্ত করার কথা উঠেছিল। কী ভয়ংকর সিদ্ধান্ত! এরা ভেবেছিল, দেশে কোনো পেশিবহুল সুস্থ মানুষের প্রয়োজন নেই। যাই হোক, বর্তমান সরকার ক্রীড়া শিক্ষকসহ সংগীতের শিক্ষক, নাট্যকলা, চারুকলা, নৃত্যকলার শিক্ষকদের ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। আশা করছি, এটা যদি কার্যকর হয় তবু একটা বড় কাজ হবে।

বিশ্বকাপে যে পরিমাণ মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায়, তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ফুটবলই সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। যার জন্য অর্থলগ্নি খুবই কম। কয়েকটি ফুটবল দিয়ে একটি স্কুলকে মাতিয়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি ক্রিকেটও থাকবে এবং যদিও নদী শুকিয়ে গেছে, তবু সাঁতারের অনুশীলনও চালু রাখতে হবে। এটা খুবই দুঃখজনক—নদীমাতৃক দেশে অধিকাংশ শিশু-কিশোর, তরুণেরা সাঁতার জানে না। স্কুলগুলোতে সাঁতার শেখানোরও অবশ্য করণীয় বিষয় হিসেবে থাকতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। এ দেশের নারীরা হিমালয় শৃঙ্গে উঠে পড়ছে। সার্ফিংয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছে। বিকেএসপি নামে যে ক্রীড়াপ্রতিষ্ঠানটি আছে, সেটিরও কিছু সফলতার গল্প আছে। এই প্রতিষ্ঠানটির সাতটি আঞ্চলিক কেন্দ্র আছে। এই কেন্দ্রগুলো আরও বেশি কার্যকর করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্কুল-কলেজ এবং অন্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো দরকার।

আবার চার বছর পরে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হবে। আমরা আশা করব, বাংলাদেশও অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে। আমরা অনুরাগী দর্শকেরা সেই দিনের অপেক্ষায় থাকব।

মামুনুর রশীদ, নাট্যব্যক্তিত্ব

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক সংকট

ক্ষমা, রাজনীতি ও ইতিহাসের দায়

জলাবদ্ধ নগরে জবাবদিহির খরা

সামাজিক অবক্ষয়ের উৎস কোথায়

প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিক্ষার ক্ষতি

হরমুজে লুকিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির চাবি

মিয়ানমারে কেন থামছে না জটিল সংঘাত

ছাত্রদের কাজকর্ম

ফেদেরিকো ফাজিনের ভাবনায় মানুষের ভবিষ্যৎ

মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কতটা যৌক্তিক