(‘অতীতকে ছিন্ন করে’ নামে একটি বই লিখেছিলেন আলেকসান্দর ফিলিপভ। তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র ‘প্রাভদা’র নিজস্ব সংবাদদাতা। প্রাভদার সংবাদদাতা হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানে তিনি বহু বছর কাটিয়েছেন। তিনি তাঁর এই বইতে পাকিস্তানের বহু ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তারই একটি অংশ ২৫ মার্চের ভয়াবহতা নিয়ে। এই অংশটা পাঠকের জন্য রুশ ভাষা থেকে অনুবাদ করে দেওয়া হলো। আজ রইল এর দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)
সকাল হলো। বাইরের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ। ক্যাফেতে জড়ো হয়ে আমরা খবর শুনছি।
জরুরি ঘোষণা: ইয়াহিয়া খানের আদেশে আওয়ামী লীগকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। দেশে জরুরি অবস্থা জারি। সংবাদপত্র ও বিদেশি সংবাদদাতাদের ওপর সেন্সর।
এক পাকিস্তানি অফিসারের কাছ থেকে জানা গেল, শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের সঙ্গে গৃহবন্দী করা হয়েছে। এ সময় করিডরের দিক থেকে হইচই শোনা গেল। রক্তে ভেজা শার্ট পরা একজন লোক দৌড়ে এসে ইংরেজিতে চিৎকার করছে: হেল্প! দে আর কিলিং আস!
সে ছিল হোটেলের একজন রানার, যে আমাদের টেলিগ্রাম পোস্ট অফিসে নিয়ে যেত। সে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারল না। এক প্রহরী তাঁকে ফেলে দিল। তাঁকে ধরে পেছনের উঠানে নিয়ে যাওয়া হলো। গুলির শব্দ শোনা গেল।
আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে অফিসার বলল: ‘ভদ্রলোকেরা, নিজের কাজে মন দিন।’
যদি বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে এমন হয়, তাহলে শহরের ভেতরে কী ঘটছিল, তা কল্পনা করা যায়! অনেক বাঙালি বিদেশি দূতাবাসে আশ্রয় নিতে ছুটল। সোভিয়েত, সমাজতান্ত্রিক দেশের মানুষ আশ্রয় দিল। ইংরেজ ও আমেরিকানরাও দরজা খুলল। কিন্তু চীনা প্রতিনিধিদের বাড়ির দরজা বন্ধ ছিল। সেই বাড়িগুলোর সামনে মৃত বাঙালিদের লাশ পড়ে ছিল।
আমরা হোটেল থেকে বের হতে চাইলে অফিসার বলল: ‘অনুমতি ছাড়া কেউ বের হতে পারব না।’
হঠাৎ দেখি কাচের দেয়ালের বাইরে একটি গাড়ি এসে থামল। নেমে এলেন এদুয়ার্দ কোলবেনেভ ও কনসাল ভ্লাদিমির কামিনিন। সোভিয়েত কনস্যুলেটের লোক। তাঁরা বললেন, ঢাকায় সারা রাত গোলাগুলি হয়েছে, তাঁরা শহরের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে সোভিয়েত নাগরিকদের খোঁজ নিয়েছেন।
—‘কেউ আহত হয়নি, কিন্তু ঢাকার বাইরে থাকা আমাদের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই।’
আমি হতাশ হচ্ছিলাম, ঘটনার কেন্দ্রে থেকেও সংবাদ পাঠাতে পারছি না। অফিসার বলল: ফোন বা টেলিগ্রাফ দেওয়া হবে না।
এ সময় সৈন্যরা দুজন লোককে ঠেলে ভেতরে আনল। চীনা কূটনীতিকের পোশাক পরা। কিন্তু তাঁরা আসলে জাপানি সাংবাদিক। চীনা সেজে তাঁরা শহরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করছিল। সকালে ধরা পড়েছেন।
হঠাৎ রেডিওতে আওয়াজ ভেসে এল। একজন বলছেন, তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর। তিনি ঘোষণা করলেন: ‘চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। বাঙালি সৈন্যরা বিদ্রোহ করেছে। আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। বিশ্বের সব শান্তিপ্রিয় মানুষকে আহ্বান করছি আমাদের সমর্থন করতে।’
পরে জানা গেল, এই ঘোষণা ভারতীয় রেডিও থেকেও প্রচারিত হয়েছে। সন্ধ্যায় জানানো হলো, সব বিদেশি সাংবাদিককে করাচি পাঠানো হবে। অফিসার বলল: ‘আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের হত্যা করতে পারে। আপনাদের নিরাপত্তার জন্যই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
আমরা বুঝলাম—এটা অজুহাত। তারা চায় না কেউ সত্য দেখুক।
এক সার্জেন্ট চুপচাপ বলল: ‘আমি সোভিয়েত ইউনিয়নকে সম্মান করি...কিন্তু আমি যদি আপনাদের সাহায্য করি, আমার পরিবার বিপদে পড়বে।’
রাত হলো। আমাদের গাড়িতে তুলে বিমানবন্দরে নেওয়া হলো। পথে আগুন, গুলি, ট্যাংক।
এক ক্যাপ্টেন বলল: ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল আক্রমণ হচ্ছে। ছাত্ররা লড়ছে।’
চারদিকে পোড়াবাড়ি। ধোঁয়া।
মাজহার আলী খান বললেন: ‘যদি বেঁচে থাকি, আমি সব লিখব...’
বিমানবন্দর ভরা মানুষ। পাঞ্জাবি ও পাঠান পরিবার সরানো হচ্ছে। আমাদের বিমানে তোলা হলো। বিমান উড়ে গেলে নিচে দেখা গেল আগুনে জ্বলছে ঢাকা। কিছুক্ষণ পর আবার আগুন—চট্টগ্রাম।
২৭ মার্চ বিকেলে করাচিতে নামলাম। বিমানবন্দরে আমাদের আটকাল। তল্লাশি। সব ফিল্ম নষ্ট করে দেওয়া হলো। নোটবুক কেড়ে নেওয়া। সব প্রমাণ মুছে ফেলা হলো। কিন্তু পরে বিশ্বের পত্রিকায় সত্য বের হয়ে গেল।...
কয়েক সপ্তাহ পরে পাকিস্তান সরকার বিদেশি সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থাগুলোর কাছে ক্ষমা চাইতে শুরু করল। চিঠি পাঠানো হলো, যেখানে বলা হলো—ঘটনাটি দুঃখজনক, সাংবাদিকদের আবার দেশে আসতে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
আমাদের পত্রিকা ‘প্রাভদা’র কাছেও ক্ষমা চাওয়া হয়। সেই সময় করাচিতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী রোয়িদাত খান ছিলেন। তিনি ইসলামাবাদ থেকে এসে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বোঝাচ্ছিলেন কীভাবে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাগুলো প্রকাশ করতে হবে। আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ডাকা হলো। আমি কক্ষে ঢুকতেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত এগিয়ে এলেন।
‘ওহ, মিস্টার ফিলিপভ! বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের তল্লাশির ঘটনা একটা ভয়ানক ভুল-বোঝাবুঝি। পুলিশকে এমন করার অধিকার কেউ দেয়নি। এই বোকা পুলিশরা সব সময় বাড়াবাড়ি করে। আপনার কর্তৃপক্ষকে বলবেন, আমরা দুঃখিত।’
তিনি মাথা ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন: ‘সাংবাদিকদের তল্লাশি করা ঠিক হয়নি। কিন্তু সবাইকে করাচিতে পাঠানো দরকার ছিল। আমাদের কাছে খবর ছিল, আওয়ামী লীগের লোকেরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা করতে পারে। এখন পরিস্থিতি শান্ত। চাইলে আবার ঢাকায় যেতে পারেন।’
আমি হেসে ফেললাম। তিনি আবার বললেন: ‘আরেকটা বিষয়... টেলিফোন স্টেশন নাকি আপনাদের মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়নি। টেলিগ্রাফ অফিসও বাধা দিয়েছে। এটাও ভুল হয়েছে। আমি নির্দেশ দিয়েছি, সোভিয়েত সাংবাদিকদের কাজে যেন বাধা না দেওয়া হয়। দেশের সব অঞ্চল এখন খোলা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘শেখ মুজিবুর রহমানের কী হয়েছে?’
উত্তর এল: ‘তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের এক কারাগারে আছেন। ভালো আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হবে।’
এরপর উপমন্ত্রী দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিতে লাগলেন কেন সরকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল: আওয়ামী লীগ নাকি ভারতের গোয়েন্দাদের সাহায্যে দেশ ভাঙতে চাইছিল, পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালিদের হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনী নাকি খুব মানবিক আচরণ করছে, হত্যাকাণ্ডের খবর ভারতীয় অপপ্রচার।
তিনি আরও বললেন: ‘চীন কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। চীন পাকিস্তানের পাশে আছে। ভারত যদি আক্রমণ করে, চীন আমাদের সমর্থন করবে।’
তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ‘কাজের অসুবিধা হলে আমার কাছে আসবেন।’
কয়েক দিন পরে করাচিতে চীনা কনস্যুলেটে এক অনুষ্ঠান হয়। সেখানে এক চীনা কূটনীতিক চৌ এনলাইয়ের বার্তা পড়ে শোনালেন, যেখানে বলা হয়েছিল—ভারত যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন করে, চীন পাকিস্তানকে সমর্থন করবে।
সময় যেতে লাগল। সরকারি সংবাদে বলা হচ্ছিল সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল না। সেনাবাহিনী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা দখল করেছিল। কিন্তু গ্রামাঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। সেখানে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার নির্দেশ দিচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধা দল গড়ে উঠছিল।
(শেষ)