হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

প্রবীণেরাও অর্থনীতির চাকা

হাসান আলী 

ফাইল ছবি

বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় প্রবীণদের শুধু অন্যের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি তাঁদের নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছে। কারণ, প্রবীণেরা শুধু অভিজ্ঞতার ভান্ডার নন, তাঁরা একটি বড় ভোক্তা গোষ্ঠীও। এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠছে, তা-ই সিলভার মার্কেটিং নামে পরিচিত। অনেক অর্থনীতিবিদ এখন মনে করেন, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হবে এটি।

‘সিলভার’ শব্দটি প্রবীণদের ধূসর চুলের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর ‘মার্কেটিং’ শব্দটি প্রবীণদের প্রয়োজন, পছন্দ, সামর্থ্য ও জীবনধারাকে পণ্য হিসেবে বাজারজাত করা বোঝায়।

একসময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানত তরুণদের লক্ষ্য করে পণ্য উৎপাদন করত। তাদের ভাবনা ছিল, তরুণেরাই সবচেয়ে বড় ভোক্তা গোষ্ঠী। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্বের বহু দেশের প্রবীণদের কাছে বিপুল পরিমাণ সঞ্চয়, পেনশন ও সম্পদ রয়েছে। তাঁরা ভ্রমণ, চিকিৎসাসেবা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বিনোদন পেতে চান। ফলে এখন ব্যবসায়ীরা বুঝতে পেরেছেন প্রবীণও ব্যবসার একটা বড় ভোক্তাগোষ্ঠী। তাঁদের উপেক্ষা করা মানে বিশাল বাজার হারিয়ে ফেলা।

এই মার্কেটিং কৌশলের বড় শক্তি হলো প্রবীণদের স্থিরতা। কারণ, তরুণদের মতো তাঁরা হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদল করেন না। যে পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা তৈরি হয়, সেটা তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করেন। এ কারণে ব্যবসায়ীরা তাঁদেরকে বিশ্বস্ত হিসেবে গ্রহণ করতে চান।

বর্তমান বিশ্বে প্রবীণদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যপণ্য, সহজ প্রযুক্তি, আরামদায়ক বাসস্থান, নিরাপদ ব্যাংকিং সেবা, অবসর ভ্রমণ প্যাকেজ, প্রবীণবান্ধব পরিবহন, হোম কেয়ার সার্ভিস—এমনকি বিশেষ মোবাইল ফোন ও অ্যাপ তৈরি করছে। এ খাতে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।

দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও আমাদের বাজারব্যবস্থা এখনো তরুণকেন্দ্রিক। তবে প্রবীণদের এই সিলভার মার্কেটিং নিয়ে দেশের ব্যবসায়ীদের ভাবা উচিত।

এখন দেশের অনেক অবস্থাসম্পন্ন প্রবীণ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাওয়ার জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নতুন পোশাক ও বই কেনা, ভ্রমণসহ ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সেবা নিতে আগ্রহী। কিন্তু সেই সুযোগ এখনো দেশের মধ্যে নেই। সে জন্য প্রবীণদের অর্থ যথাযথভাবে খরচ করার জন্য সিলভার মার্কেটিংয়ের দিকে নজর দেওয়া দরকার।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিলভার মার্কেটিং মানে শুধু প্রবীণদের কাছে পণ্য বিক্রি নয়। এটি তাঁদের সম্মান, স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মমর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি দৃষ্টিভঙ্গি। বিজ্ঞাপনে প্রবীণদের অসহায় নয়, বরং সক্রিয় ও অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ, ইতিবাচক উপস্থাপনাও বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এখন এই মার্কেটিং পলিসি নিয়ে বড় পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশও যদি এখন থেকে প্রস্তুতি নেয়, তাহলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির বোঝা নয়, বরং সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির মূল শক্তি মানুষ। আর প্রবীণেরাও সেই শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অভিজ্ঞতা যেমন সমাজকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি তাঁদের ভোগ, ক্ষমতা ও বাজারে অংশগ্রহণ অর্থনীতিকে গতিশীল করবে নিশ্চিতভাবে।

হাসান আলী, প্রবীণবিষয়ক সংগঠক ও লেখক

সম্প্রীতি ও আত্মপরিচয়ের মেলবন্ধন

অর্থনীতির অসুখ সারানো জরুরি

প্রাগৈতিহাসিক আয়নায় আধুনিকতা

দুটি মৃত্যু: শোক কার, দায় কার

যন্ত্রের শক্তিতে কৃষির রূপান্তর

গোলান মালভূমিসহ যেকোনো ভূখণ্ডের জবরদখলই দস্যুতা

পর্যটনকেন্দ্রে মৃত্যুফাঁদ, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বদলে নতুন করে স্বাক্ষরের চিন্তা আত্মঘাতী

সাফারি পার্কে পশুপাখি মারা যাচ্ছে কেন

সংস্কৃতির সংকট, জাতীয় স্বার্থ ও বন্দর রক্ষা